বিএনপি দুই দফায় ২৭২টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। প্রার্থী ঘোষণার আগে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নেওয়া সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা না করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তারা। বিস্ময় প্রকাশ করে তারা বলেছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন ও সরকার গঠনের যে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই ২৭২টি আসনে মনোনয়ন ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করা হয়েছে।
এদিকে আলোচনা না করে প্রার্থী ঘোষণা করায় বিএনপির সঙ্গে ২০ বছরের সম্পর্ক অবসানের ঘোষণা দেয় লেবার পার্টি। অন্যদিকে ক্ষোভ প্রকাশ করে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘বিএনপি সমমনাদের সঙ্গে বসে আলোচনা না করেই নিজেদের মতো প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এতে জোটবদ্ধ নির্বাচন নিয়ে স্পষ্টতা কমে গেছে এবং বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়েছে।’ তবে গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় ৩৬ আসনের প্রার্থী ঘোষণার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বাকি আসনগুলো রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বাকি আসনগুলোতে প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।’
এ বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করায় জোট ও সমমনাদের মধ্যে অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। আমরা মনে করছি, এটি বিএনপির আগের ঘোষণার ব্যত্যয়। এতে করে দুর্দিনের বন্ধুদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অবিশ^াস্য কৌশল অবলম্বন করে বন্ধু বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি বন্ধুদের হারানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। এর অভিঘাত এখনই বোঝা যাবে না। সময় লাগবে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বিএনপিকে বন্ধুহীন করছে কি না, এটা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা অপেক্ষা করব। ভবিষ্যৎ কী হবে তা নির্ভর করবে বিএনপির আচরণের ওপর। বিএনপি তীরে এসে তরী ডোবাচ্ছে কি না, তা ভাবার বিষয়।’
জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখনো ২৮ আসন বাকি রেখেছি। তাছাড়া যেসব আসনে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করেছে, তা চূড়ান্ত নয়। সময় রয়েছে সামনে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করি আমরা।’
গতকাল শুক্রবার ১২-দলীয় জোটপ্রধান জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারের খিলগাঁও কার্যালয়ে আগামী নির্বাচন ও যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী বিএনপির ঘোষিত ২৭২টি মনোনয়নের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, বিএনপি তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে প্রার্থী ঘোষণায় বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন তারা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন ও সরকার গঠনের যে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এ ২৭২টি আসনে মনোনয়ন ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও করণীয় সম্পর্কে আগামী সোমবার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জোটের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করা হবে। সংবাদ সম্মেলনের স্থান ও সময় আগামীকাল ঘোষণা করা হবে। সভা শেষে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনায় মোনাজাত করা হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও ১২-দলীয় জোটপ্রধান মোস্তফা জামাল হায়দার, জোটের সমন্বয়ক বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, ন্যাশনাল লেবার পার্টির চেয়ারম্যান লায়ন ফারুক রহমান, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন পারভেজ, বাংলাদেশ এলডিপির মহাসচিব তমিজ উদ্দিন টিটু ও সিনিয়ার ভাইস চেয়ারম্যান এমএ বাসার, ইসলামিক পার্টির মহাসচিব আবুল কাশেম, ইউনাইটেড লিবারেল পার্টির চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম, প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী দল (পিএনপির) চেয়ারম্যান ফিরোজ মো. লিটন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি জাকির হোসেন, নয়া গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি এমএ মান্নান, মহাসচিব ইমরুল কায়েস, বাংলাদেশ জাতীয় দলের মহাসচিব সারোয়ার আলম, জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব নজরুল ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব ইলিয়াস হোসেনসহ জোট নেতারা।
এদিকে গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা করে বাংলাদেশ লেবার পার্টি। এতে সভাপতিত্ব করেন পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। সভা শেষে তিনি বিএনপির সঙ্গে ২০ বছরের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবসানের ঘোষণা দেন। ইরান বলেন, ‘২০০৬ সাল থেকে বিএনপির সমমনা জোট, ১৮ দল, পরে ২০-দলীয় জোট এবং যুগপৎ আন্দোলনে ঘনিষ্ঠ শরিক হিসেবে কাজ করেছে লেবার পার্টি।’
তিনি বলেন, “আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে আমি নিজে গ্রেপ্তার হয়েছি। যুবলীগের হামলায় আহত হয়েছি। অসংখ্য মামলা রয়েছে আমার বিরুদ্ধে। পাঁচবার কারাবরণ করেছি। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে আমার দলের দুই কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। আমরা ছিলাম বিএনপির ‘সবচেয়ে নিবেদিত, বিশ্বস্ত ও ত্যাগী’ শরিক দল। কিন্তু সেই সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত ভাঙল।”
দলটির সভায় নেতারা অভিযোগ করেছেন, বিএনপি শরিকদের প্রতি ‘অবজ্ঞা’, ‘অসম্মান’ ও ‘বেইমানিপূর্ণ আচরণ’ করেছে। আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনের প্রশ্নে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পাশাপাশি মিত্র দলগুলোকে ‘মাইনাস করে’ এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার চেষ্টা করছে বিএনপি। এসবই সম্পর্কছেদের কারণ। তাছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘চিহ্নিত চাঁদাবাজ, হত্যা মামলার আসামি, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের’ মনোনয়ন দিয়েছেন। এসব মনোনয়ন টাকার বিনিময়ের মনোনয়ন বাণিজ্য। এভাবে বিএনপি নিজের ‘নৈতিক নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ’ করেছে এবং ‘রাজনৈতিক চরিত্রকে দুর্বল’ করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইরান ঝালকাঠি-১ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি এ আসনে রফিকুল ইসলাম জামালকে মনোনয়ন দিয়েছে।
ক্ষোভ রয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। ঢাকা-১৮ আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন জাসদের সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন। সেখানে বিএনপি এসএম জাহাঙ্গীর হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছে। গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ঢাকা-৮ আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি সেখানে আগেই দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে মনোনয়ন দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছিল, ঢাকা-৯ আসনে সাইফুল হককে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। তবে গত বৃহম্পতিবার সেখানে বিএনপির ঢাকা মহানগর নেতা হাবিবুর রশীদ হাবিবকে মনোনয়ন দিয়েছে।
বিএনপি দ্বিতীয় দফা প্রার্থী ঘোষণার পর গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের সংগ্রাম’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে গণতন্ত্র মঞ্চ। সভায় মান্না বলেন, ‘সময়টা অত্যন্ত জটিল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। খালেদা জিয়া অসাধারণ জনপ্রিয় নেত্রী। তার অবস্থার এমন অবনতি হলে বিএনপি আদৌ নির্বাচন করতে পারবে কি না সেই প্রশ্ন আছে। তবে নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’
সভায় সভাপতিত্ব করেন জাসদের সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন। বক্তব্য দেন ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য আকবর খানসহ অন্য নেতারা।
রাতে তোপখানা রোডে নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক বৈঠক হয়। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আগামী তিন মাসের জন্য বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়কের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সভায় জাতীয় নির্বাচনে মঞ্চের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার ব্যাপারেও জোর দেওয়া হয়। এরপর গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে গণফোরামের কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠক হয়। সভায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নেতারা আলোচনা করেন। বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়েও তারা কথা বলেন। বৈঠকে গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সভাপতিম-লীর সদস্য অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক, মোশতাক আহমেদ, প্রচার-প্রকাশনা সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ মধু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।