ঝুলে গেছে মুক্তেশ্বরী নদী দখলে করে অবৈধ প্লট উচ্ছেদ প্রক্রিয়া 

যশোরের ভাতুড়িয়ায় মুক্তেশ্বরী নদী দখল করে তৈরি করা প্লট উচ্ছেদ প্রক্রিয়া ঝুলে গেছে। গত অক্টোবরে জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভায় এই দখল উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হলেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ বিলম্বিত হওয়ায় নদীখেকোরা আদালতের শরণাপন্ন হয়। আদালত থেকে তারা অস্থায়ী নিধেষাজ্ঞার আদেশ পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। 

এদিকে দখল উচ্ছেদ বিলম্বিত হওয়ায় হরিণা বিলাপাড়ের বাসিন্দাদের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী দ্রুত দখল উচ্ছেদের দাবিতে শুক্রবার দুপুরে ভাতুড়িয়া ছোট নারায়নপুর ব্রিজের পাশে সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে তারা দাবি করেন, দ্রুত দখল উচ্ছেদ করে বিল থেকে পানি নামিয়ে দিলে প্রায় এক হাজার বিঘা জমিতে বোরো আবাদ সম্ভব হবে।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ ধরে ধীরে ধীরে দখল প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি প্রভাবশালী চক্র যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া ও ভাতুড়িয়া পূর্বপাড়ার মাঝের মুক্তেশ্বরী নদীর সম্পূর্ণ অংশ ভরাট করে নেয়। এরপর গত জুলাই মাসে জমিতে প্লট তৈরি করে বিক্রির জন্য নোটিশ টাঙানো হয়। এ নিয়ে গত আগস্ট মাসে সংবাদ প্রকাশ হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এই দখল উচ্ছেদে স্থানীয়রা একাট্টা হলে গত ২৪ আগস্ট জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভায় বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। 

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদারের নেতৃত্বে চার সদস্যের এই কমিটি গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করে। এই প্রতিবেদনে মুক্তেশ্বরী নদী দখলের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। 

মুক্তেশ্বরী নদীর ভাতুড়িয়া মৌজা অংশের প্রতিবেদনে বলা হয়, রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় সিএস রেকর্ডে মুক্তেশ্বরী নদীর ভাতুড়িয়া অংশে চাঁচড়া জমিদার রাজা বরদাকান্ত রায়ের নামে সিএস ১৯৭৮ ও ১৯৮০ নং দাগের ৩৮১ শতক খাল শ্রেণি হিসেবে রেকর্ড হয়ে মুক্তেশ্বরী নদীর অংশ হিসেবে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এসএ রেকর্ডেও রাজা বরাদাকান্ত রায়ের ওয়ারেশদের নামে ওই জমি খাল শ্রেণি হিসেবে নদীর অংশ এবং উন্মুক্ত ছিল। 

কিন্তু এরপর আরএস মাঠ জরিপে সরকারের পক্ষে কালেক্টর, যশোরের নামে ৩৪০ শতক খাল ও ধানী হিসেবে রেকর্ড হয়। এরপর আরএস জরিপ রেকর্ডে সেই জমি (৩৮১ শতক) মোস্তফা কামাল উদ্দিন, মোস্তফা জালাল উদ্দিন ও মোস্তফা আওয়াল উদ্দীনের নামে পুকুর ও ধানী জমি হিসেবে রেকর্ড হয়ে যায়। 

অর্থাৎ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তেশ্বরীর এই অংশ সরকারি হলেও অনিয়মের মাধ্যমে তা ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হয়েছে।

গত ২৯ অক্টোবর নদী রক্ষা কমিটির সভায় সাবেক জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সিদ্ধান্ত হয়, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুততার সঙ্গে উক্ত ভরাট অংশ পুনঃখননের ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং প্রয়োজনী ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ সহায়তা দেবে।

এদিকে, নদী রক্ষা কমিটির এই সিদ্ধান্তের পর এক মাস পার হলেও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার এই সুযোগে  গত ১ ডিসেম্বর যশোর সদর সিভিল জজ আদালতের দ্বারস্থ হন জমির রেকর্ডধারী মোস্তফা জামাল উদ্দিন। আদালত মোস্তফা জামালের আর্জি আমলে নিয়ে মুক্তেশ্বরী খননে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

ওই জমির কেয়ারটেকার যশোর রেজিস্ট্রি অফিসের এক সময়ের পিয়ন নূর ইসলাম নুরু জানান, ওই জমির মালিক মোস্তফা জালাল উদ্দিন আদালতে মামলা করেছেন। আদালত ওই জমিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।

মুক্তেশ্বরী দখলের প্রতিবেদন ও আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিশ্চিত করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদার জানান, তারা আদালতের নির্দেশনা পেয়েছেন। তবে ওই নদীর ওই জমি দখল ও ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ডের সত্যতা তারা পেয়েছেন। এ ব্যাপারে যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।