সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার সার আত্মসাৎ করেন পরিবহন ঠিকাদার ও সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) কামরুল আশরাফ খান পোটন। আত্মসাৎকৃত টাকার কিছু অংশ দিয়ে তিনি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে-বিদেশে বাড়ি-গাড়ি কেনেন। অবশিষ্ট টাকা কোথায় রেখেছেন তার হদিস মিলছে না। কেউ কেউ মনে করছেন, পোটন যে পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তা দেশেই লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, ওই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন। তার দেড় হাজার কোটি টাকার গন্তব্য কোথায় এখনো তা অজানা।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পোটনের সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমেছে। দুদকের সহকারী পরিচালক মো. সহিদুর রহমান তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করছেন।
দুদকের তথ্যমতে, কামরুল আশরাফ খান পোটন ছিলেন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পরিবহন ঠিকাদার। তিনি ২০২১-২২ অর্থবছরে দুটি প্রতিষ্ঠানের এক হাজার ৬৬৫ কোটি ৫৯ লাখ ১৮ হাজার ৪৭৪ টাকার সার আত্মসাৎ করেন। এর মধ্যে বিসিআইসির আমদানিকৃত ৫৮১ কোটি ৫৮ লাখ ৯ হাজার ৬৪ টাকা মূল্যের ৭২ হাজার টন সার আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৩ সালের ২৭ নভেম্বর পোটনসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এরপর বিএডিসির আমদানিকৃত ১ হাজার ৮৪ কোটি ১ লাখ ৯ হাজার ৪১০ টাকা মূল্যের ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭১ মেট্রিক টন সার আত্মসাতের ঘটনায় চলতি বছরের ৭ মে আরেকটি মামলা করে দুদক। সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে সরকারের ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৫৯ লাখ ১৮ হাজার টাকার সার আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে সংস্থাটি।
জানা গেছে, সাবেক এমপি পোটন ১ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার সরকারি সার আত্মসাতের পর সেই টাকা দিয়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বাড়ি-গাড়ি, জমি ও ফ্ল্যাট কেনেন। আত্মসাৎকৃত টাকার একটি অংশ বিদেশে পাচার করে সেখানে বাড়ি-গাড়ি কেনেন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেন বলে অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। কমিশন অভিযোগটির অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. সহিদুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়। সহিদুর রহমান অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে কামরুল আশরাফ খান পোটন, তার স্ত্রী দিলরুবা আশরাফ খান ও তাদের দুই সন্তানের নামে এবং বেনামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য জানতে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেন। চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দপ্তর থেকে তথ্য দুদকে পাঠানো হয়, যা এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, পোটন সংসদ নির্বাচনের সময় তার সম্পদের হিসাব বিবরণী ও আয়কর নথি নির্বাচন কমিশনে দাখিল করেছিলেন। সেই হিসাব এবং তার সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত অনেক তথ্যই এ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। তিনি ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনে যে হিসাব জমা দিয়েছেন তাতে দেখা গেছে, তার নরসিংদীর পলাশে ৭ কোটি ৪২ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের ৩৭১.১০ শতাংশ জমি, ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৬ হাজার ৫১৮ টাকার মূল্যের একটি বাড়ি, ১৬ কোটি ২১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা মূল্যের বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া অস্থাবর সম্পদ হিসেবে নগদ ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা, ব্যাংকে জমা ৯৭ লাখ টাকা, এফডিআর ৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকার চারটি প্রাইভেট ও জিপ গাড়ি, ১০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা মূল্যের ১০টি কার্গো জাহাজ, ১০ লাখ টাকার স্বর্ণ ও ১১ লাখ টাকার আসবাবপত্র রয়েছে। সব মিলিয়ে তার সম্পদের মূল্য ৫০ কোটি টাকা।
২০১৩ সালের হিসাবের পর পোটনের নামে যেসব সম্পদ যুক্ত হয়েছে : রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, তিনি ২০১৪ সালে ১৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় উত্তরায় ৩ কাঠা, সোয়া ৪ কোটি টাকায় পূর্বাচলে ৫ কাঠার প্লট; ২০১৫ সালে ১১ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় রাজধানীতে ৩৩০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট; ২০১৬ সালে দেড় কোটি টাকায় রাজধানীতে ২১২০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ও ৪০ হাজার টাকায় ডেমরায় ১৪.৭০ শতাংশের প্লট; ২০১৭ সালে নরসিংদীর পলাশে ৩০০.২৩ শতাংশ জমি; ২০১৮ সালে সাড়ে ১৩ কোটি টাকায় নরসিংদীর পলাশে ৯.৭১ একর জমি; ২০১৯ সালে নরসিংদীর পলাশে সাড়ে ৪ কোটি টাকায় ৪.০৮ একর জমি; ২০২০ সালে সাড়ে ৫ কোটি টাকায় নরসিংদীর পলাশে ৩.৬৬ শতাংশ জমি এবং ২০২২ সালে বারিধারায় ৫ কোটি টাকায় ৪১০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট কেনেন।
তথ্য বলছে, পোটন ২০২১-২২ অর্থবছরে এক হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার সার আত্মসাৎ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সার পরিবহনের ভাড়া বাবদ আয় এবং অন্যভাবেও আয় করেছেন। তিনি যে পরিমাণ আয় করেছেন, সেই আয়ের বিপরীতে দেশে থাকা সম্পদের পরিমাণ একেবারেই কম। এর মধ্যে তিনি মাত্র ৫ কোটি টাকায় বারিধারায় ফ্ল্যাট কিনেছেন। তার সার আত্মসাতের এক হাজার ৬৬০ কোটি টাকার গন্তব্য এখনো অজানা। পোটনের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৬ হাজার স্থাপনাসহ দেশে থাকা সম্পদের পরিমাণ ১০০ থেকে ১১০ কোটি টাকার মতো। তার সার আত্মসাৎকৃত অর্থ কোথায় মজুদ রাখা হয়েছে বা পাচার করা হয়েছে তার খোঁজে ব্যস্ত রয়েছে দুদক।
দুদকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সাবেক এমপি পোটনের এমপি হওয়ার আগে যে পরিমাণ সম্পদ ছিল বর্তমানে সে তুলনায় তার সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। সব মিলিয়ে তার দেশে ১০০ থেকে ১১০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। তিনি যে পরিমাণ সরকারি সার আত্মসাৎ করেছেন সে হিসেবে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ হওয়ার কথা ১৬০০-১৭০০ কোটি টাকা, কিন্তু এত সম্পদ তার নেই। তাহলে তার টাকাগুলো কোথায় গেল? এমনও হতে পারে, তিনি হুন্ডির মাধ্যমে টাকা বিদেশে পাচার করেছেন।