সংকটাপন্ন অবস্থায় ১৬ দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেওয়ার ব্যাপারে সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে দলটি। তারই ধারাবাহিকতায় খালেদা জিয়াকে লন্ডন নিতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স কাল মঙ্গলবার ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। পরদিন বুধবার সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি ছেড়ে যাওয়ার কথা। তবে সবকিছু নির্ভর করছে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের ওপর। বিমানযাত্রা উপযুক্ত মনে হলে তবেই চিকিৎসকদের অনুমতি সাপেক্ষ তাকে লন্ডন নেওয়া হবে। সূত্র জানায়, গতকাল রবিবার খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। আগের মতো স্থিতিশীল রয়েছে। এদিনও দেশি-বিদেশি চিকিৎসকরা তার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। তাতে খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি। যদিও তার মেডিকেল বোর্ডের তরফে শনিবার বলা হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন এখনো বিমানযাত্রার সক্ষমতা অর্জন করেননি। সেজন্যই লন্ডনযাত্রা বিলম্ব হচ্ছে। আগামী ৯-১০ ডিসেম্বরের দিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে লন্ডন নেওয়া হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক বলেন, ‘কয়েক দিন ম্যাডামের স্বাস্থ্যের অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে, তিনি মেডিসিন গ্রহণ করতে পারছেন। এটাকে পরোক্ষভাবে উন্নতিও বলা যেতে পারে। চিকিৎসকরা আশাবাদী।’
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ম্যাডামের চিকিৎসা চলছে। আগে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান লন্ডন থেকে ম্যাডামের চিকিৎসার সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিতেন। এখন তিনি দেশে এসে হাসপাতালে গিয়ে মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সশরীরে নিবিড়ভাবে কাছ থেকে ম্যাডামের চিকিৎসা দেখভাল করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘অতীতের দুঃসময়ে অনেক বাধা সত্ত্বেও মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা ম্যাডামের চিকিৎসা করেছিলেন, তারাই এখনো দিনরাত পরিশ্রম করে ওনার চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। কোনো গুজবে কান না দিয়ে ম্যাডামের শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।’
এদিকে চিকিৎসাধীন শাশুড়ি খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে থেকে স্বাস্থ্যসেবাসহ সার্বিক তদারকি করছেন পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান। গতকাল বিকেল পৌনে ৪টার দিকে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যান।
দুপুরের পর থেকে হাসপাতালের সামনে নেতাকর্মীদের তেমন ভিড় করতে দেখা যায়নি। খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনা করে রবিবারও সারা দেশে দোয়া ও মোনাজাত করেছে বিএনপি।
অন্যদিকে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে লন্ডন নিতে যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করা হয়েছে, সেটি মঙ্গলবার ঢাকায় আসার সূচি চেয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। সূত্রের মতে, জার্মান এয়ারলাইনস এফএআই অ্যাভিয়েশন গ্রুপ তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে আবেদনটি করেছে। আবেদনে আগামীকাল মঙ্গলবার ঢাকায় অবতরণ এবং পরের দিন বুধবার লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার সূচি চাওয়া হয়েছে। ওই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ফ্লাইটকে ‘ভিভিআইপি মুভমেন্ট’ ইতিমধ্যে ফ্লাইট অবতরণের ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়েছে।
উন্নত চিকিৎসার জন্য কাতার আমিরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে শুক্রবার ভোরের দিকে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু ‘কারিগরি ত্রুটির কারণে’ সেই বিমান আসতে বিলম্ব হওয়ার কথা জানায় বিএনপি। এরপর শুক্রবার বলা হয়, কাতার আমিরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স আর আসছে না। এর বদলে কাতারের আমির জার্মানি থেকে ভাড়া করে একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠাবেন। কিন্তু সেই অ্যাম্বুলেন্স কবে আসবে, কিংবা খালেদা জিয়াকে কবে লন্ডনে নেওয়া হবে, তা বিএনপির তরফ থেকে এখনো জানানো হয়নি।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের তরফে শনিবার বলা হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন এখনো বিমানযাত্রার সক্ষমতা অর্জন করেননি। সেজন্যই তার লন্ডনযাত্রা বিলম্ব হচ্ছে।
এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি বোম্বার্ডিয়ার চ্যালেঞ্জার (সিএল-৬০) সিরিজের দুই ইঞ্জিনের জেট উড়োজাহাজ। এতে অ্যাম্বুলেন্সের যাবতীয় সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। সিরিয়াল নম্বর বলছে, উড়োজাহাজটি প্রস্তুতকারক কোম্পানি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ২০১৮ সালে। এতে ভেন্টিলেটর, মনিটরিং ইউনিট, ইনফিউশন পাম্প, অক্সিজেন সরবরাহ, ওষুধপত্র, চিকিৎসাসামগ্রীসহ অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে। উড়োজাহাজটিতে থাকবেন অভিজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও প্যারামেডিকস, যারা আকাশপথে নেওয়া রোগীদের নিবিড় পরিচর্যা বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান রাখেন।
২৩ নভেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন খালেদা জিয়া। ২৭ নভেম্বর থেকে ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’ অবস্থায় তিনি ওই হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলেও চিকিৎসকদের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিকিৎসা চলছে তার।
৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতাসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। গত ৮ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। লন্ডন ক্লিনিকে ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৫ জানুয়ারি ছেলে তারেক রহমানের বাসায় লন্ডনের ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক প্যাট্রিক কেনেডি ও অধ্যাপক জেনিফার ক্রসের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেন। যুক্তরাজ্যে উন্নত চিকিৎসা শেষে ৬ মে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন।