খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধানে আইনি সংস্কার চলছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণের সমস্যার সমাধানে আইনি সংস্কার চলছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
গতকাল সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ২০২৫’ এবং ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা : বাংলাদেশ অগ্রগতি প্রতিবেদন ২০২৫’ এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা প্রকাশ উপলক্ষে এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় তিনি বলেন, ‘দেশীয় পুনরুদ্ধারের মধ্যে রয়েছে খেলাপিদের সম্পত্তি, ব্যাংকের শেয়ার এবং অন্যান্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা। আন্তর্জাতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারি সংস্থার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে, যারা বিদেশে আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান; এমনকি যারা হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি, তাদের কার্যক্রম চালু রাখতে “রিংফেন্সিং” নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ম্যানেজমেন্টকে কোনো সুবিধা নিতে না দিয়ে অপারেশনাল ফাইন্যান্সিং নিশ্চিত করা হচ্ছে, যাতে কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং অর্থ আবার সিস্টেমে ফিরে আসে।’
এই প্রক্রিয়াগুলো সফল হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে গভর্নর বলেন, ‘তবে সম্পদ পুনরুদ্ধারে সময় লাগবে।’
তিনি বলেন, ‘আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সুশাসন এজেন্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষত ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, অপর্যাপ্ত মূলধন এবং সুশাসনের অভাব ছিল বড় সমস্যা । ভালো সুশাসন এবং স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অপ্রীতিকর হলেও পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। গুড গভর্নেন্সের অংশ হিসেবে কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছে : কোনো ব্যাংক লোকসান করলে বা মূলধন ঘাটতিতে থাকলে তারা কোনো লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এমনকি কর্মীদের জন্য কোনো বোনাসও অনুমোদিত হবে না।’
গভর্নর বলেন, ‘ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স এখন বাস্তবায়নের পথে, যার মাধ্যমে তিনটি ব্যাংক এবং ৯টি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রেজুলেশন করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘গত ১৬ থেকে ১৭ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান গুরুতর চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে এবং বাহ্যিক খাতে স্থিতিশীলতা অর্জনের দিকে প্রাথমিক মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে ছিল উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বিনিময় হারের অস্থিরতা, ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের ভয়াবহ পরিস্থিতি, বড় অঙ্কের চলতি হিসাবের ঘাটতি, রিজার্ভের পতন এবং তারল্য সংকটসহ ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা।’
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল সাধারণ বাণিজ্যপ্রবাহ পুনরায় চালু করা। কারণ প্রায় হাফ বিলিয়ন ডলারের বকেয়া জমে যাওয়ায় অধিকাংশ করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকগুলো হয় অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিচ্ছিল; অথবা লেনদেনের সীমা কমিয়ে দিচ্ছিল।’
তিনি বলেন, ‘গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় দিনেই বৈদেশিক ব্যাংকারদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়। তাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয় যে বাংলাদেশ তার বাধ্যবাধকতা পূরণ করবে এবং সমস্যাটির সমাধান করা হবে। বর্তমানে সেই বকেয়া সম্পূর্ণরূপে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।’
অনেকে বিনিময় হারকে স্থির রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমালোচনা করলেও গভর্নর বলেন, ‘স্থির রাখার উদ্দেশ্য ছিল না, বরং পরিবেশ অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত অস্থির পরিস্থিতিতে বিনিময় হারকে ভাসতে দেওয়া হয়নি। যদি তা করা হতো, তবে দেশের মুদ্রা শ্রীলঙ্কা (ডলার প্রতি ৩০০ রুপি) বা পাকিস্তানের (ডলার প্রতি ২৭৯ টাকা) মতো জায়গায় নেমে যেতে পারত, হয়তো ১৯০ থেকে ২০০ টাকা হয়ে যেত।’
তিনি বলেন, ‘এই কঠোর নীতির ফলে বর্তমানে বিনিময় হার ১২২+ এর কাছাকাছি স্থিতিশীল রয়েছে। বাহ্যিক ফ্রন্টে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে যেমন, চলতি হিসাবে সারপ্লাস তৈরি হচ্ছে এবং রিজার্ভে বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
মুদ্রানীতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার ওপর জোর দিয়েছে, যা মূলত ডলারের অবমূল্যায়ন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বাহ্যিক উৎস থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্দেশ্যে সুদের হারের নীতিতে সামান্য হলেও “পজিটিভ রিয়েল রেট” বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক মূলনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সুদের হার নির্ধারণ বা বিনিময় বাজারে কোনো প্রকার প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বা মূল্য আবিষ্কারের প্রক্রিয়াতে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। বাজেট অর্থায়নের জন্য নতুন টাকা ছাপানো হচ্ছে না; বরং সরকারের প্রয়োজন মেটাতে বাজার থেকে তহবিল সংগ্রহ করা হচ্ছে।’