স্ট্রং রুমের অস্ত্র ময়লার স্তূপে

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পুরনো আমদানি কার্গো হাউজে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একের পর এক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আগুনের সময় স্ট্রং রুম অক্ষত থাকলেও পোড়া অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা হয়েছে কার্গো হাউজের পুড়ে যাওয়া ময়লার স্তূপ থেকে। বিষয়টি নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠেছে স্ট্রং রুমে আগুন না লাগলেও সেখানকার অস্ত্রগুলো পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ধ্বংসাবশেষেই এলো কীভাবে। এই নিয়ে ধূ¤্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টির রহস্য উদঘাটনে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ধ্বংসাবশেষ সরানোর সময় সেখানে ৮টি পিস্তল, একটি শটগান এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাওয়া গিয়েছিল। সর্বশেষ অভিযানে আবার পরিত্যক্ত অবস্থায় ৯টি পোড়া অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে পিস্তল ও শটগানের বিভিন্ন অংশ এবং উপাদান, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সুরক্ষিত স্ট্রং রুমেই থাকার কথা। উদ্ধারের পরপরই বিমানবন্দর পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থল ঘেরাও করে অস্ত্রগুলো জব্দের প্রক্রিয়া শুরু করে। নিরাপত্তা সংস্থা ও তদন্তকারী ইউনিট ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বিস্তারিত নমুনাও সংগ্রহ করেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, সবচেয়ে অস্বাভাবিক বিষয় হলো স্ট্রং রুম অক্ষত, নথিও অক্ষত তবুও বাইরে ধ্বংসাবশেষে মিলছে অস্ত্র। তারা মনে করছেন, এটি শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়, বরং কোথাও না কোথাও গুরুতর অনিয়ম বা গোপনীয়তা লুকানোর ইঙ্গিত থাকতে পারে। অস্ত্রগুলো আগে কোথায় সংরক্ষিত ছিল, কীভাবে বাইরে এলো, কারা দায়ী এসব প্রশ্ন এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু। গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টিকে ইতিমধ্যেই উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তদন্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, স্ট্রং রুমে আগুন না লাগলেও বাইরে অস্ত্র পাওয়া অস্বাভাবিক। আমরা প্রতিটি অস্ত্রের উৎস, সংরক্ষণ প্রক্রিয়া এবং অগ্নিকান্ডের সম্ভাব্য যোগসূত্র পরীক্ষা করছি।

জানা গেছে, স্ট্রং রুম সিল হওয়ার আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তখন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সময়মতো ব্যবস্থা নিলে অস্ত্র সংরক্ষণ বা জব্দ প্রক্রিয়ার অনিয়ম আগেই ধরা পড়ত। অগ্নিকান্ডের পর পুরো কার্গো হাউজে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। প্রবেশপথে স্ক্যানিং বৃদ্ধি, অতিরিক্ত পুলিশ টহল ও নজরদারি চলছে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর সিরিয়াল নম্বর, উৎপত্তি এবং সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের তথ্য মিলিয়ে সমন্বিত তদন্ত চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো সংবেদনশীল স্থানে ধ্বংসস্তূপে অস্ত্র পাওয়া কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের তদারকির ঘাটতি, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য অসদাচরণের প্রতিফলন।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার বোশরা ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এর আগে আমদানি কার্গো হাউজের স্ট্রং রুমের ভল্টে পাওয়া যায় আরও ৩৬টি অস্ত্র। তিনটি কার্টন থেকে উদ্ধার করা হয় এসব অস্ত্র। স্ট্রং রুমের আমদানি পণ্যের তালিকা করতে গিয়ে অস্ত্রের চালানটি পাওয়া যায়। গত ১৮ অক্টোবর ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে কার্গো হাউজে। এরপর কার্গো হাউজের স্ট্রং রুমের পণ্যের তালিকা তৈরি করতে ১৭ নভেম্বর কাস্টমস ও বিমানের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ২০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি স্ট্রং রুম তল্লাশি করে এসব অস্ত্রের সন্ধান পায়। কার্গো হাউজে অগ্নিকা-ের পর স্ট্রং রুম থেকে মালামাল হারানোর অভিযোগ ওঠে। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, আগুনে বহু মালামাল পুড়ে গেছে। বাস্তবে দেখা যায়, ভল্টে আগুন লাগেনি, ভল্ট ছিল ভাঙা এবং সেখান থেকে অস্ত্র গায়েবের ঘটনা ঘটে।

বেবিচক সূত্র জানায়, থার্ড টার্মিনালে তৈরি করা নতুন ওয়্যারহাউজ নিয়ে বিশাল জটিলতা তৈরি হয়েছে। আগুনে পুরনো ওয়্যারহাউজ প্রায় পরিত্যক্ত হওয়ার পর নতুন ওয়্যারহাউজ চালুর উদ্যোগ নিলেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত রবিবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠিও দেয় বেবিচক। কিন্তু চিঠি পেয়ে বকেয়া হাজার কোটি টাকা দাবি করে গত মঙ্গলবার পাল্টা চিঠি দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া থার্ড টার্মিনালের কার্গো হাউজ চালু করতে হলে লাগবে দেশি-বিদেশি তিন সংস্থার সার্টিফিকেট। কোরিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের (এডিসি) পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, আমদানি কার্গো টার্মিনাল নির্মাণকাজ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সম্পন্ন হয়। নিয়োগকর্তা নিজস্ব কারণে টেকওভার সার্টিফিকেট জারি করতে বিলম্ব করে। ফলে স্থাপনা ও মূল্যবান সরঞ্জাম ক্ষতির আশঙ্কা এড়াতে স্থাপনা বুঝে নেওয়ার আগপর্যন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজ খরচে রক্ষণাবেক্ষণ করেছে। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত খরচ চলতি বছরের ৬ আগস্ট অবহিত করা হয়। খরচের অর্থ বেবিচক কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করেনি। প্রকল্প সম্পদের সুরক্ষায় ঠিকাদারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বেবিচক অতিরিক্ত কাজের জন্য অর্থ পরিশোধ করছে না, যা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এই বিষয়ে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনুমতি দিলেই থার্ড টার্মিনালের কার্গো হাউজ চালু করা সম্ভব হবে না। এটা সর্বাধুনিক অটোমেটিক সিস্টেম। সর্বাধুনিক এ কার্গো হাউজ চালু করতে হলে দেশি-বিদেশি অন্তত তিন প্রতিষ্ঠানের অনুমতি লাগবে। এটি আন্তর্জাতিক নকশা অনুযায়ী তৈরি করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের সার্টিফিকেট, সিটি টেক্স থেকে সার্টিফিকেট ও স্ক্যানার মেশিন ও প্রশিক্ষিত কর্মী লাগবে। এসব এখনো পাওয়া যায়নি।