শ্রমিক পাঠিয়ে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লুট

মালয়েশিয়ার জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে দেশের ৬০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও কর্মকর্তারা রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ায় সরকার নির্ধারণের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায়ের মাধ্যমে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেছেন। এমন অভিযোগের প্রমাণ থাকায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ৬০টি পৃথক মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার আসামি ১২৪ জন। তারা আড়াই লাখেরও বেশি ব্যক্তির কাছ থেকে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন।

গতকাল বুধবার দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

দুদকের এ পদক্ষেপ এমন এক সময় মামলার খবর এসেছে, যখন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) ভোটের আমেজ বিরাজ করছে। আগামী ১৭ জানুয়ারি সংগঠনটির ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দুদকের মামলার বিষয়ে জানাজানি হলে বায়রায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকে দুদকের এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে।

এর আগে ৪০টি ওভারসিজ কোম্পানির স্বত্বাধিকারী, চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালকসহ ১০৮ জনের বিরুদ্ধে ৩ হাজার ৪৩৮ কোটি ৯৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৪০টি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। যা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে ওই ঘটনায় ১০০টি পৃথক মামলা দায়ের হয়েছে যার মধ্যে আসামি ২৩২ জন। আর আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ ৭ হাজার ৯৮৪ কোটি ১৫ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, মামলায় ৬০ রিক্রুটিং এজেন্সির ১২৪ মালিকদের বিরুদ্ধে ২ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৬ জনের কাছ থেকে ৪ হাজার ৫৪৫ কোটি ২০ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

দুদক জানিয়েছে, মালয়েশিয়া রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং অর্থপাচারের অভিযোগে ৬০টি ওভারসিজ কোম্পানির স্বত্বাধিকারী, চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অভিযোগে বায়রার বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে তারা সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট গড়ে চুক্তি ভঙ্গ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিকদের কাছ থেকে সরকারের নির্ধারিত ফির কয়েকগুণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছেন। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একজন কর্মীর মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যয় ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক প্রভাব ও বায়রার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাচক্র ব্যবহার করে এই খরচকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। শ্রমিক বাছাই, অর্থসংক্রান্ত প্রক্রিয়া ও চুক্তিভিত্তিক শর্তাবলি উপেক্ষা করা হয়েছে। মামলাগুলোতে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০ (বি), ১৬১, ১৬২,১৬৩, ১৬৪, ১৬৫ (ক), ৪২০ ও ৪০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে সরকার ইন্টারন্যাশনালের মোহাম্মদ আলী সরকার; দি গাজীপুর এয়ার ইন্টারন্যাশনালের এএম শাহীন আহম্মেদ (বাবলু) এবং ফেরদৌস আহম্মেদ বাদল; ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনালের রফিকুল ইসলাম; মোর্স ঐশী ইন্টারন্যাশনালের মিসেস লিনা রহমান; পাথ ফাইন্ডার ইন্টান্যাশনালের মাজহারুল ইসলাম; আল বোখারী ইন্টারন্যাশনালের মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া, মো. আতাউর রহমান ভূঁইয়া, মোহাম্মদ জাকারিয়া ভূঞা, আব্দুর রহমান; মালয়েশিয়া বাংলাদেশ হোল্ডিংস প্রাইভেট লিমিটেডের রুহুল আমীন, শিউলী বেগম, মাসুম বিল্লাহ, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান; মেসার্স আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনালের মোহাম্মদ আবুল বাসার, মোহাম্মদ ফজলুর রহমান; দি সুপার ইস্টার্ন লিমিটেডের শাহীন কবির, হুমায়ুন কবীর; ট্রান্স এশিয়া ইন্টিগ্রেট সার্ভিসেস লিমিটেডের জামাল আবু জাঈদ, মো. সানাউল্লাহ।

এ ছাড়া স্ট্যানফোর্ড এমপ্লয়মেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড; পিএন এন্টারপ্রাইজ কোম্পানি; দরবার গ্টেলাবাল ওভারসিস; আল খামিস ইন্টারন্যাশনাল; দিশারি ইন্টারন্যাশনাল; এসওএস ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেস; আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স; নিউ এজ ইন্টারন্যাশনাল; হায়দারি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল; আমিয়াল ইন্টারন্যাশনাল; ইস্ট ওয়েস্ট প্যারাডাইস; বেসিক পাউয়ার অ্যান্ড কেয়ার ওভারসেজ; বিডি গ্লোবাল বিজনেস; ফিউচার ইন্টারন্যাশনাল; আহাদ ইন্টারন্যাশনাল; আগা ইন্টান্যাশনাল; এলিগ্যান্টস ওভারসেজ; আলহেরা ওভারসেজ; এএনজেড মাল্টি ইন্টারন্যাশনাল; মদিনা ওভারসেজ; নেক্সট ওভারসেজ; ইউনাইটেড এক্সপোর্ট; গ্যালাক্সি করপোরেশন; ম্যানেইজ পাওয়ার করপোরেশন; এশা ইন্টারন্যাশনাল; মুবিন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল; জেজি আল ফালাহ; নিউ হেভেন ইন্টারন্যাশনাল; মনছুর আলী ওভারসিজ; ম্যাচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল; নাতাশা ওভারসিজ; শান ওভারসিজ; অপরাজিতা ওভারসিজ; মোহাম্মদ নুরুজ্জামান অ্যান্ড সন্স; ত্রিবেনী ইন্টারন্যাশনাল; আক্তার রিক্রুটিং এজেন্সি; মৃধা ইন্টারন্যাশনাল; ফোর সাইট ইন্টারন্যাশনাল; সুলতান ওভারসিজ; রানওয়ে ইন্টারন্যাশনাল; প্রভাতি ইন্টারন্যাশনাল; জনতা ট্রাভেলস; উইন ইন্টারন্যাশনাল; কমফোর্ট ওভারসিজ কনসালট্যান্ট; কিসওয়া এন্টারপ্রাইজ; আমান এন্টারপ্রাইজ; রমনা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল; আল ফারাহ হিউমান রিসোর্স অ্যান্ড কনসালট্যান্সি; প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড টুরিসম এবং কাশীপুর ওভারশিজ।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বায়রার একজন নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, আগামী ১৭ জানুয়ারি তাদের সংগঠনের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য ভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের সময়ে দুদকের এ পদক্ষেপকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন। তারমতে, মালয়েশিয়ার বাজারে শ্রমবাজার নিয়ে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। দুদক তাদের শনাক্ত ও মামলার আওতায় নিয়ে আসায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম বাড়বে। এ সিন্ডিকেটের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে ভবিষ্যতে কোনো এজেন্সি দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করার সাহস পাবে না। পাশাপাশি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে স্বচ্ছতা ও জাবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এতে শ্রমবাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং সব এজেন্সি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যবসায় টিকে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হবে।