তফসিলকে স্বাগত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যে তফসিল ঘোষণা করেছে তাকে স্বাগত জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী কার্যক্রমের শুরুতেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করার দাবি জানিয়েছে দলগুলো। এসব করতে না পারলে এই নির্বাচন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ভূলুণ্ঠিত করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দলগুলোর নেতারা।

তফসিল ঘোষণায় সন্তোষ প্রকাশ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। নির্বাচনে যে তফসিল ঘোষণা হয়েছে তাতে আমরা মোটামুটিভাবে সন্তুষ্ট। শব্দের একটু এদিক-ওদিক থাকতে পারে সে বিষয়গুলো আমি খুব বেশি বড় করে দেখি না। মূল বিষয়টা হচ্ছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ঘোষণা হয়েছে যেটা আমি মনে করি যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত বড় উল্লেখযোগ্য ঘটনা। একই সঙ্গে আমরা মনে করি, আজকে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।’

গণতন্ত্র ফেরানোর দাবিতে দীর্ঘদিন কারাবরণকারী বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের দিন। আমি বরাবরই বলেছি, নির্বাচনের ব্যাপারে আমার কোনো আশঙ্কা নেই, নির্বাচন হবে কি হবে না এ রকম শঙ্কাও ছিল না। নির্বাচন হতেই হবে সেটা হয়েছে, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ নির্বাচন হবে।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পালন করা এবং অনুষ্ঠান করা এটা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। আমরা প্রত্যাশা করি যে, নির্বাচন কমিশন একেবারে নিরপেক্ষভাবে, সুষ্ঠুভাবে, অবাধ এবং একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে।’

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করার দায়িত্ব প্রশাসনের-মিয়া গোলাম পরওয়ার : নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা জানিয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা-৫ আসনের জিরোপয়েন্ট এলাকায় গণসংযোগ শেষে ইসি ঘোষিত তফসিল নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অবাধ, গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব দলের সমঅধিকার নিশ্চিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। তবে এ দায়িত্ব প্রশাসনের।’ তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো কর্মকর্তা বিশেষ দলের প্রার্থীদের বেশি সুযোগ দেবে এমন প্রত্যাশা নয়। সবাইকে সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা থাকলেও স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার অভাব রয়েছে-নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী : তফসিল ঘোষণা করায় অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ একটি সুন্দর নির্বাচন দেখতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে আমরা একটি ইতিহাস সৃষ্টি করতে চাই। আপনারা সংস্কারের জন্য দল-মত-নির্বিশেষে “হ্যাঁ” কে জয়যুক্ত করে একটা নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠন করবেন। আমরা আশা করছি, এই সরকার আগামীতে রিফর্ম অ্যাসেম্বলি, গণভোট ও সংস্কারের পক্ষে দাঁড়াবে।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা থাকলেও স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার অভাব রয়েছে। সারা দেশে অস্ত্রের ঝনঝনানি হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে পেশিশক্তি, টাকার প্রভাব, গডফাদারদের সংস্কৃতি ও দলীয় প্রভাবের বাইরে কতটা নিরপেক্ষ থাকবে এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আশা করছি কমিশন তা কাটিয়ে ওঠে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেবে।’

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘এই নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র জনগণের হোক। কোনো দলীয় গু-াবাহিনী, চাঁদাবাজি, মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত কেউ যেন দখল করতে না পারে। কমিশনের কাছে দাবি জানাই, প্রার্থীরা যেন বিধি মোতাবেক নির্ধারিত ২৫ লাখ টাকার ভেতরেই প্রচারণা চালায় এটাতে সজাগ দৃষ্টি রাখুন। তাছাড়া, পোস্টারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে এবার সুন্দর নির্বাচন হবে বলে আশা রাখছি।’

এদিকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিবৃতিতে তারা বলেছেন, তফসিল ঘোষণা হলেও দেশে নির্বাচনের এখনো কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, মনোনয়ন নিয়ে সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে সন্ত্রাসী কর্মকা- অব্যাহতভাবে বেড়েই চলেছে। কিছু কিছু এলাকায় ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় হামলা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। সারা দেশে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাস দমনে সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারেনি। এমতাবস্থায় একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

ইসি তফসিল ঘোষণার পর বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘বিগত ১৭ বছর ধরে দেশের জনগণ যে নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে, সে নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করেছে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে মাইলফলক হবে সে প্রত্যাশা সবার। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি তা কাটিয়ে উঠতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।’

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ও মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা আশা করি, তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অর্থবহ নির্বাচনের পথ সুগম হবে।’ তারা আরও বলেন, ‘নির্বাচন যেন প্রকৃত অর্থে জনগণের ভোটাধিকার ও মতামত প্রতিফলিত করতে পারে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সে লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাই।’