কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযোগের স্তূপ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশে বিএনপির অর্ধশতাধিক আসনে মনোনয়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে উঠেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণার পর থেকেই দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযোগের স্তূপ জমা হচ্ছে। মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মাঠে আন্দোলন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন থেকে শুরু করে লিখিত অভিযোগ দাখিল সবই চলছে সমান্তরালভাবে। 

তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অযোগ্য, নিষ্ক্রিয়, বয়োবৃদ্ধ ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়ায় তৃণমূলে অস্থিরতা প্রকট হয়েছে। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়, তরুণ ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের বাদ দিয়ে হাইব্রিড, সুবিধাভোগী এবং সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠদের মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে দাবি তাদের।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক দফা মাঠ জরিপ ও সাংগঠনিক মতামতের ভিত্তিতে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত নয়। প্রয়োজন হলে পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু তৃণমূলের কোন্দল মেনে নেওয়া হবে না সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে যেতে হবে।’ 

গত ৩ নভেম্বর ২৩৭টি এবং ৪ ডিসেম্বর আরও ৩৬টি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করে দলটি। এর মধ্যে একটি আসনে পরিবর্তন এনে মোট ২৭২ আসনে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে বিএনপি। তালিকা ঘোষণার পর থেকেই দেশব্যাপী ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছে। প্রথম দফা সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংক্ষুব্ধরা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালন করে প্রার্থী বদলের দাবি জানিয়ে আসছে। 

তাদের ভাষ্য, দলের চিহ্নিত একটি সিন্ডিকেট ও কতিপয় সিনিয়র নেতার কারসাজিতে অযোগ্যদের মূল্যায়ন করে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে যারা রাজপথে ঘাম ঝরিয়েছে, রক্ত দিয়েছে, কারাগারে গেছে, মামলার পর মামলায় ভুক্তভোগী হয়েছে, নির্যাতনের শিকার হয়েছে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেকাংশে নব্য ও হাইব্রিডের সঙ্গে বয়োবৃদ্ধ ও বিতর্কিতদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। 

এ রকম অভিযোগের মধ্যে গত ৩ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরাবর চট্টগ্রাম-১২ আসনের ৬৮০ জন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এনামুল হক এনামকে পরিবর্তন করে ধানের শীষের প্রার্থী চূড়ান্ত করার আবেদন জানিয়েছেন তারা। আবেদনে তারা এনামকে বিতর্কিত উল্লেখ করে বলেন, এনামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে নিরীহ মানুষের প্রতি এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য ও এস আলমের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় পটিয়া পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়নসহ প্রত্যেক গ্রামের জনগণের প্রবল আপত্তি রয়েছে। 

অভিযোগে তারা বলেন, এলাকায় দলের জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে তার অনুসারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ মাফিয়া লোকজন বেয়াদবি ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও সমালোচনা করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছেন। ফলে দলীয় ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়েছে। 

পটিয়া উপজেলা বিএনপির নেতা মিজবাহুল চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, এই আসনে আওয়ামী লীগ আমলে গুমের শিকার ও বিএনপি নেতা সৈয়দ সাদাত আহমেদের মতো পরিচ্ছন্ন ও কর্মীবান্ধব নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে আসনটি বিএনপির হতে পারত। 

গত ২৩ নভেম্বর দলীয় কার্যালয়ে দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী সাদিক রিয়াজ পিনাক চৌধুরীর বিরুদ্ধে একই আসনের অপরাপর তিন মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা বিএনপির সহসভাপতি মোজাহারুল ইসলাম, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ কালু এবং জেলা বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক কেন্দ্রীয় শিক্ষক নেতা অধ্যাপক মন্জুরুল ইসলাম লিখিত অভিযোগে বলেন, সাদিক রিয়াজ ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আরাম-আয়েশে ব্যবসায়িক সুবিধা লাভ করেছেন। ২০২৩ সালে প্রথম ও একমাত্র রাজনৈতিক মামলার শিকার হন এবং নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আওয়ামী লীগের নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সুপারিশে তিনি ছাড়া পেয়ে যান। এর ফলস্বরূপ তিনি খালিদ মাহমুদ চৌধুরীকে ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার একটি সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে সহায়তা করেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ৫ আগস্ট পরবর্তী বিভিন্ন মিল-কারখানা থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নিজ দলীয় কর্মীকে হত্যাচেষ্টা, মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্যও তুলে ধরেন ওই তিন নেতা। 

স্থানীয় বিএনপি নেতা ইসমাইল চৌধুরী জানান, পিনাক চৌধুরী বোচাগঞ্জ উপজেলার হওয়ায় জামায়াতের প্রার্থী এগিয়ে থাকবে। 

গত ২৯ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনের দুই উপজেলা বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা লিখিত অভিযোগে বলেন, এই আসনে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রার্থী মুশফিকুর রহমান বিগত ১৭ বছর কানাডা প্রবাসী ছিলেন। নব্বইয়ের বয়োবৃদ্ধ এই নেতা অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাচল করতে পারেন না। কোনো গণসংযোগও করতে পারেন না। শারীরিকভাবে এমন অক্ষম নেতা প্রার্থী হিসেবে বহাল থাকলে আগামীতে নিশ্চিত পরাজয় বরণ করতে হবে। 

আখাউড়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকতার খান বলেন, এই আসনে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন, মাঠে ছিলেন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া। তরুণ এই নেতাকে মনোনয়নবঞ্চিত করায় শুধু দলের নেতাকর্মী নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ বিরাজ করছে। 

কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী মেহেদী হাসান রুমীকে পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে দুই উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির নেতারা লিখিত অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, রুমী বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ নেতা। তার পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রম সম্ভব নয়। আসনটিতে প্রার্থী বদল না হলে হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন ওইসব নেতা। 

খোকসা উপজেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক সাংবাদিকদের বলেন, এই আসনে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ সাদীসহ কয়েকজন তরুণ, মার্জিত ও শিক্ষিত হিসেবে এলাকায় যথেষ্ট সুনাম রয়েছে।  দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা দেওয়া আরেক অভিযোগে জামালপুর-২ আসনের নেতাকর্মীরা জানান, এই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সুলতান মাহমুদ বাবুকে। বয়সের ভারে অসুস্থ এই নেতা ওয়ান ইলেভেনে সংস্কারপন্থি ছিলেন। এর আগে কে এম ওবায়দুর রহমানের সঙ্গেও দল ভেঙে চলে গিয়েছিলেন। বিগত দিনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্যের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা কিংবা জিডিও হয়নি। এই আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এ এস এম আব্দুল হালিমসহ বেশ কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়ন চান। 

গত ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির এক আবেদনে নেতারা জানান, চট্টগ্রাম-১৩ আসনে সরওয়ার জামাল নিজাম প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছেন। ৮০ বছরেরও বেশি বয়স্ক এই নেতা দীর্ঘ সময় আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের নাম দেখে অনেকেই হতবাক ও ব্যথিত হয়েছেন। নির্যাতিত-নিপীড়িত কর্মী হিসেবে বিএনপি ঘোষিত সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার দাবিতে প্রতিনিয়ত আন্দোলন করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আব্বাস বলেন, দলের দুঃসময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল এ রকম কাউকে দলীয় প্রার্থী দেওয়ার জন্য দলের হাইকমান্ডের কাছে আবেদন করছেন। 

নৈতিক স্খলনের একাধিক ভিডিওচিত্র প্রকাশ হয়ে পড়ায় নেত্রকোনা সংসদীয় আসন নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা উপজেলা) বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রাথমিক সম্ভাব্য ঘোষিত প্রার্থী আবু তাহের তালুকদারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। এই আসনে প্রার্থী পরিবর্তন না হলে শুধু নারী ভোটার নয়, সাধারণ ভোটারও বিমুখ হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন উপজেলা বিএনপির সদস্য ইকরামুল আলম। 

সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছেন আইনুল হক। তার বিরুদ্ধে এলাকায় নানা অভিযোগ রয়েছে। এ আসনে মনোনয়নের জন্য বিএনপির দুঃসময়ের নেতাদের বিবেচনা করা হয়নি বলে ক্ষোভ জানান স্থানীয় বিএনপির নেতারা। তিন মনোনয়নপ্রত্যাশী আইনুল হকের মনোনয়ন বাতিল চেয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে চিঠি দিয়েছেন। 

গত ১৯ নভেম্বর তারেক রহমান বরাবর এক চিঠিতে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিরুদ্ধে অপর সাত মনোনয়ন প্রত্যাশী অভিযোগ করেন।