বুদ্ধিজীবীদের কোনো দল নেই, তারা গণমানুষের

শোকের দিন আজ। অপার বেদনার ১৪ ডিসেম্বর। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র এক দিন আগে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। পাকিস্তানি সেনাদোসরদের উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন হলেও বাংলাদেশ যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। বেদনাবিধুর এই দিনটিতে হাজারো মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় মুখরিত হবে বধ্যভূমির স্মৃতিসৌধগুলো।

বুদ্ধিজীবীর কোনো দল নেই, গণমানুষ তার দল। মানুষের অধিকারের কথাই তার একমাত্র সেøাগান। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই তার কাজ। আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হওয়া উচিত বুদ্ধিজীবীর বলার জায়গা তৈরি করা। তার বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তর্কের জায়গা তৈরি করা। আমাদের রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ এ জায়গাতেই। জাতির সংকটে-দেশপ্রেমের প্রশ্নে বুদ্ধিজীবীরা কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, তার উদাহরণ আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবীরা...

আজ ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য চক্রান্ত করে। এরই অংশ হিসেবে বাঙালি শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, আইনজীবী, শিল্পী, দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন। এর দুই দিন পর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় আসে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণী দিয়েছেন। যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালনের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, তখন বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যা ছিল নৃশংসতম ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ঠিক দুই দিন পর ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বাধীন বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বিজয়ের পর রাজধানীর রায়েরবাজার ইটখোলা ও মিরপুরের বধ্যভূমিসহ ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের চোখ-হাত বাঁধা ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায়।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণী দিয়েছেন। যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালনের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

সকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টার নেতৃত্বে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য এবং যুদ্ধাহত ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে। দেশের সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

মহান বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। গত শুক্রবার সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এসব কর্মসূচির কথা জানান।

দলটির ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে সকাল ৯টায় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দলীয় নেতারা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। একই দিন বেলা আড়াইটার দিকে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বিএনপি।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মহান বিজয়ের চেতনা স্মরণে দলীয়ভাবে এসব কর্মসূচি পালন করা হবে।’

আজ ভোরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের কার্যালয়গুলোতে কালো পতাকা উত্তোলন ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং সকাল ৯টায় মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবে জামায়াতে ইসলাম। মহান বিজয় দিবস ও শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী।

গত শুক্রবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে দলটি। পাশাপাশি, দেশব্যাপী দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে আলোচনা সভা, র‌্যালি ও দোয়ার মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর ‘মহান বিজয় দিবস’ যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালন করার জন্য সব শাখা সংগঠন ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সিনিয়র প্রচার-সহকারী মুজিবুল আলম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে জানানো হয়েছে, আগামী ১৪ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকার কৃষিবিদ হলে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের উদ্যোগে বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠিতব্য এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

আগামীকাল রাজধানী ঢাকার ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিতব্য এই

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। আগামী ১৬ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কেন্দ্রীয় যুব বিভাগের উদ্যোগে যুব ম্যারাথন বা যুব র‌্যালি অনুষ্ঠিত হবে।

কেন্দ্রীয় যুব বিভাগের উদ্যোগে সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিতব্য এই র‌্যালি শাহবাগ, কাঁটাবন, সায়েন্স ল্যাব ও কলাবাগান হয়ে ঐতিহাসিক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে মিলিত হবে। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান এই র‌্যালিতে নেতৃত্ব দেবেন।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন ও মহান বিজয় দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্র্তৃপক্ষ।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, সকাল ৬টা ২০ মিনিটে উপাচার্য ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভবনসমূহে কালো পতাকা উত্তোলন, সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে জমায়েত, সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণের কবরস্থান, জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণের স্মৃতিসৌধ ও বিভিন্ন আবাসিক এলাকার স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ।

এরপর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ও রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের উদ্দেশ্যে যাত্রা। সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

এ ছাড়া, বাদ আসর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামিয়াসহ বিভিন্ন হল মসজিদ ও অন্য উপাসনালয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মার মাগফিরাত এবং শান্তি কামনায় দোয়া ও প্রার্থনা করা হবে।