ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে খুব কাছ থেকে গুলি করেন ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল (৩৭)। আর তার মোটরসাইকেলের চালক ছিলেন আলমগীর শেখ। তারা দুজন পূর্বপরিকল্পনা করে দীর্ঘ একটা সময় রেকি করেন এবং হাদির নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার সঙ্গে থাকেন। কীভাবে হাদিকে মারা হবে, কখন গুলি করে নির্বিঘেœ দেশত্যাগ করা যাবে, সে বিষয়গুলো ছিল পরিকল্পনায়। গুলি করার ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে সীমান্তে পৌঁছান তারা। আগে থেকে প্রস্তুত রাখা হয় সীমান্ত পারাপারের সবকিছু। মাত্র ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে খুব সহজেই সীমান্ত পার হয়ে যান হামলাকারীরা।
গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলছে, শুক্রবার বিকেলে সবাই অবসর সময় কাটায়। তাই শুক্রবার জুমার নামাজের পর টার্গেট করে ঘাতকরা। যে অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটিও পাশের একটি দেশের। একটি মাত্র ফায়ারে অস্ত্রটিও লক হয়ে গিয়েছিল। বেলা ২টা ২৫ মিনিটে হাদিকে গুলি করা হয়। এরপর ফয়সাল ও আলমগীর মোটরসাইকেলে মোহাম্মদপুর হয়ে উত্তরা আসেন। পরে তারা মোটরসাইকেল রেখে মাইক্রোবাসে করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তে চলে যান। সেখানে আগে থেকে প্রস্তুত থাকা লোকের মাধ্যমে শুক্রবার রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে দেশ ত্যাগ করেন ফয়সাল ও আলমগীর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও বলছে, কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া ফয়সাল ছাত্রলীগের কর্মী ও আলমগীর যুবলীগের কর্মী। তারা আগে থেকে প্রস্তুতি রেখেই এ মিশনে অংশ নেয়। ঘাতক দুজন কোনো স্থানেই বিশ্রাম নেয়নি। তারা চলতি পথে একাধিক মোবাইল সিম পরিবর্তন করে। ময়মনসিংহের একটি রিসোর্টে অবস্থান নেয় মাত্র ৩০ মিনিট। পরে রাত ১১টায় ফের হালুয়াঘাট সীমান্তের উদ্দেশে যাত্রা করে তারা। রাত ৩টায় হালুয়াঘাটে পৌঁছা মাত্রই সেখানকার স্থানীয় গারো সম্প্রদায়ের একজনের মাধ্যমে দেশত্যাগ করে। ওই গারো সম্প্রদায়ের লোকটিও তাদের সঙ্গে পাশের এলাকায় অবস্থান করে।
তবে গতকাল রবিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, চিহ্নিত দুজন ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তাদের দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার কোনো তথ্য নেই। তবে তারা যেন পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য বিজিবি এবং সব বন্দরকে সতর্ক করা হয়েছে। দেশের সীমান্ত দিয়ে মানুষ পারাপার করে এমন কয়েকজনের ব্যাপারে তথ্য নিয়ে দুজনকে আটকও করা হয়েছে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে মাসুদের পাসপোর্ট ‘ব্লক’ করা হয়েছে।
ডিএমপির গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, হাদিকে গুলির সময় যে বাইক ব্যবহার করা হয়েছে, সেটির চালক আলমগীরের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে আটক করেছে ডিবি। তারা হলো মো. মিলন ও হাবিবুর রহমান হাবিব। গতকাল রবিবার ভোরে রাজধানীর অদূরে হেমায়েতপুরের জাদুর চর থেকে তাদের আটক করা হয়। আটক দুজন কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া বাইকচালক আলমগীরের খুবই ঘনিষ্ঠ। ঘটনার দিন আলমগীর ও আটক দুজনের মধ্যে সব মিলিয়ে শতাধিকবার মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে।
একটি সূত্র বলছে, বাইকচালক আলমগীরের মোবাইল ফোন থেকে মিলনের মোবাইল ফোনে ৭৪ বার যোগাযোগের তথ্য মিলেছে। অন্যদিকে হাবিবের মোবাইল ফোন থেকে আলমগীরের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয়েছে ৫২ বার।
সীমান্তে মানব পাচার চক্রের দুই সদস্যসহ আটক ৩ : হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় শেরপুর নালিতাবাড়ী সীমান্ত এলাকা থেকে মানব পাচার চক্রের দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে এক মোটরসাইকেল মালিককে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে র্যাব। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শেরপুর থেকে আটক করা দুজন বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ পথে লোক পারাপার চক্রের সদস্য। তারা হাদির ওপর হামলাকারী ব্যক্তিকে বর্ডার দিয়ে পার করতে পারে এমন সন্দেহে আমরা তাদের আটক করে নিয়ে এসেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের বর্ডারে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছি। বিজিবিকে মেসেজ দিয়েছি কোনোভাবেই যেন সন্ত্রাসীরা দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে। যারা এ ঘটনায় জড়িত, সবাইকে আমরা শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
এদিকে হাদির ওপর হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির নম্বর প্লেটের (রেজিস্ট্রেশন নম্বর) সূত্র ধরে আবদুল হান্নান নামের এক ব্যক্তিকে র্যাব আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। গত শনিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে আটক করা হয় তাকে। ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার তালেবুর রহমান বলেন, হত্যাচেষ্টার এ ঘটনায় আবদুল হান্নানের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওসমান হাদিকে গুলি করা অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। এর মধ্যে শুটারকে শনাক্ত করা হয়েছে।
মোটরসাইকেলের মালিক আবদুল হান্নানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যায় শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন ঢাকার মহানগর হাকিম দিদারুল আলম। সহকারী পিপি মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন জানান, পুলিশের সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে।
তিন দিনেও মামলা হয়নি : পুলিশ জানায়, ‘হাদির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তাদের পরিবারের লোকজন এখনো থানায় আসেনি। আমরা একটি কপি লিখে রেখেছি, মামলার কপিটা আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাব, তারা যদি এটি সাইন করে ভালো, তা না হলে আমরা পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করব। হাদিকে গুলির ঘটনায় কোনো মামলা না হওয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় হান্নানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে চার কারণ উল্লেখ করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন পল্টন মডেল থানার এসআই সামিম হাসান। গুলির কোনো ব্যালেন্সটিক পরীক্ষা হয়েছে কি না, এটি জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, যেহেতু এখনো মামলা হয়নি, তাই আদালতের নির্দেশ ছাড়া এটির ব্যালেন্সটিক পরীক্ষা করার কার্যক্রম শুরু হয়নি।’
জুলাই যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা : সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এন এস নজরুল ইসলাম বলেন, এদিকে হাদির ওপর গুলির ঘটনায় সারা দেশে জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা ইস্যু নতুন করে সামনে এসেছে। ঢাকাসহ সারা দেশের জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তিনি আরও বলেন, হাদি একজন নন, দেশে হাজারো, লাখো জুলাই যোদ্ধা রয়েছেন। প্রত্যেকের জন্য আলাদা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্র ও রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি যেসব সম্মুখসারির জুলাই যোদ্ধা উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের বিষয়ে আলাদা করে থ্রেট অ্যানালাইসিস করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী হাই-প্রোফাইল ও ঝুঁকিপূর্ণ জুলাই যোদ্ধার জন্য বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচন সামনে রেখে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট-টু’: নির্বাচনকালীন সময়ে সহিংসতা ও নাশকতা ঠেকাতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট-টু’ শুরু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই অভিযান শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশে জোরদার করা হচ্ছে। যারা দুষ্কৃতকারী, অস্ত্রধারী কিংবা নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে তাদের আইনের আওতায় আনাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।
হামলাকারীদের ধরতে ভারতের সহযোগিতা চাইল সরকার : হাদিকে গুলিবর্ষণকারীদের গ্রেপ্তারে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে সরকার। গতকাল ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে সহায়তা চাওয়ার কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, সন্দেহভাজনদের ভারতে পলায়ন ঠেকাতে দেশটির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। আর যদি তারা ইতিমধ্যে ভারতে প্রবেশ করে, তাহলে যেন দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ করা হয়। ভারতে থেকে ‘বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকা- চালাতে’ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বান জানানোর কথাও তুলে ধরা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
ফয়সালের স্ত্রী, শ্যালক ও বান্ধবী আটক : হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় মূল সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের স্ত্রী, শ্যালক ও এক বান্ধবীকে আটক করেছে র্যাব। তারা হলেন ফয়সালের স্ত্রী সামিয়া, শ্যালক শিপু ও বান্ধবী মারিয়া। গতকাল ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে পল্টন থানায় হস্তান্তর করা হয়।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনার আগে-পরে তিনজনের সঙ্গে ফয়সালের যোগাযোগ ছিল সন্দেহে তাদের আটক করা হয়েছে। আমরা তাদের সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করেছি। বাকি তদন্ত থানা পুলিশ করবে।