রাজাকার আলবদরদের তালিকা হতে পারত

মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীরপ্রতীক খেতাব লাভ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের নানান দিক নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। তার সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরেছেন ফয়সাল খান

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মিরণ জিল্লা কলোনির পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অবদানের কথা স্মরণ করে ফারুক-ই-আজম বলেন, নিম্ন শ্রেণির দরিদ্র মানুষেরাই মূলত যুদ্ধটা করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বড়লোকেরা এড়িয়ে গেছেন। কৃষক-শ্রমিকের সন্তানেরাই মূল কাজটা করেছে। এলিট শ্রেণির যারা ছিল, তারা সীমান্তের ওপারে গিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এসে কৃতিত্ব নিয়েছে।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে গঠিত সরকার চাইলেই এসববিষয় নিষ্পত্তি করতে পারত। কিন্তু তৎকালীন সরকার চায়নি মুক্তিযুদ্ধ প্রতিষ্ঠিত হোক। কেন চায়নি, তা আমি জানি না।

তিনি আরও জানান, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শেখ মুজিব বলেছে, তোমরা যার যার কাজে ফিরে যাও। তখনই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হওয়ার দরকার ছিল, কিন্তু তা করেনি। কত লোক মারা গেল তারও একটা তালিকা করা হলো না। আমরা তো দেশ কারও কাছ থেকে ভিক্ষা করে পাইনি, কেউ কি দেশটা আমাদের এমনি এমনি দিয়েছে? আমরা লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছি।

তিনি বলেন, সেই লড়াইয়ে কেউ জীবন দিয়েছেন, কেউ আহত হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের একটা তালিকা হতে পারত, শহীদের একটা তালিকা হতে পারত, শরণার্থীদের তালিকা হতে পারত। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে রাজাকার-আল বদর তাদেরও একটি তালিকা হতে পারত। তাহলে সবকিছু নিষ্পন্ন হয়ে যেত। এতে ইতিহাস নিয়ে আর আমাদের এত দোলাচালে থাকতে হতো না।

ফারুক-ই-আজম বলেন, ওই সরকারের একটা অংশ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে। তাজউদ্দিন আহমেদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলামরা তখন ছিলেন। তারা এই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার জন্য প্রথম ঢাকায় এসে ২৩ ডিসেম্বর কেবিনেট মিটিং করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, রাজাকারের তালিকা ও ৮০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হবে এগুলো ওই মিটিংয়ে তারা রেজুলেশন করেছিল। কিন্তু শেখ মুজিব আসার পর সব ভন্ডুল হয়ে গেছে।

উপদেষ্টা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সরকারে এতই অনাচার হয়েছে যে ৫৪ বছর পর যখন মন্ত্রণালয়ে উঠলাম, আমার কাছে দুঃখবোধ আর গ্লানি ছাড়া কোনো আনন্দ সংবাদ নাই। বিগত ১৫ বছরে প্রচুর অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে। ১৯৮০ সালে জন্ম হয়েছে, সেই লোক মুক্তিযোদ্ধা! যুদ্ধের সময় ২ বছর বয়স, সেই লোক মুজিব নগর সরকারের কর্মচারী! এভাবে মুক্তিযোদ্ধার খাতায় তালিকাভুক্ত হয়ে বড় বড় ঘুষের জায়গায় চাকরি নিয়েছে। এখন তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। এই মামলায় তারা লাখ লাখ টাকা খরচ করছে।

তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণে শেখ মুজিব ঘোষণা দিয়েছে, তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়। এটা ছিল আন্দোলনের পার্ট। যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২৬ মার্চের পর থেকে। আওয়ামী লীগ সরকার শেখ মুজিবের এই ভাষণকে সংবিধানের পার্ট করেছে। যে কারণে বয়সের কারণে আর কোনো ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, ইতিহাস নিয়ে যে সন্দেহের একটা দোলাচাল, এই দোলাচালের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দৃঢ়তা আসছে না। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কে ভালো বলছে, কে খারাপ বলছে তারা নির্ণয় করতে পারছে না। এতে আমরা বৃক্ষের মতো দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারছি না। এজন্য এই অনাচার দায়ী।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বলেন, সবকিছু নিয়ে একটা বেদনা, দুঃখবোধ আমার মনে কাজ করছে। যেহেতু আমি নিজেই মুক্তিযুদ্ধ করেছি, তাই নিজের কাছে এক ধরনের মর্ম বেদনা কাজ করে।

তিনি বলেন, সত্য প্রতিষ্ঠা না হলে এমন আরও বহু প্রজন্ম কনফিউশনে থাকবে। কারণ আমরা আমাদের ইতিহাসের ওপর দাঁড়াইতে পারছি না। স্বাধীনতা বিরোধী বলে বয়ান তৈরি করা হয় শুধু। স্বাধীনতা বিরোধী হলে মামলা কর না কেন? মামলা করে তার বিচার করেন। স্বাধীনতার ৫৪ বছর হয়ে গেছে, আর কতকাল এসব চলবে। এগুলো নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।

সবকিছুর জন্য বস্তু নিষ্ঠতা লাগবে। কিন্তু এতে কারও সদিচ্ছা ছিল না। যারা এই অনাচারগুলো করেছে, তারাই আবার মুক্তিযুদ্ধের ধরাক-বাহক। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, তাদের কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন করা যেত না।

মিরণ জিল্লা কলোনির শহীদ পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়ে তিনি বলেন, আপনি যে বিষয়টা নিয়ে কাজ করছেন, কাজ করেন। কোনো দৃঢ় ভিত্তি বা তথ্য প্রমাণ থাকলে মন্ত্রণালয় এটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। আমরা চাই না দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা কোনো মানুষ বঞ্চিত হোক।