পাকিস্তানিদের একগুঁয়েমির কারণেই একাত্তরে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। গতকাল মঙ্গলবার সকালে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতের যুব বিভাগের ম্যারাথন কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
জামায়াত আমির বলেন, ‘পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আমাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছিল। তাই দেশের মানুষ তাদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের হাত ধরে সত্তরের সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল। এ নির্বাচনের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একগুঁয়েমির কারণে নির্বাচিত দল ও জনপ্রতিনিধিরা, যারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেনÑ তারা তাদের রাজনৈতিক অধিকার পাননি। সেদিন জনগণের ভোটের প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই একটি যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।’
তিনি বলেন, ‘যারা সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বৈষম্যহীন শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর তারা ক্ষমতায় বসে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিলেন। তারা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন, সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিলেন, মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। রক্ষীবাহিনী গঠন করে যখন যাকে ইচ্ছে তাকে খুন করা হয়েছিল, মা-বোনদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হয়েছিল। বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে পরিবারতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘পুরনো ব্যবস্থার রাজনীতি ছুড়ে ফেলে দিয়ে নতুন ব্যবস্থার রাজনীতিতে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। যেই রাজনীতি হবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে, খুনের বিরুদ্ধে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে, মামলাবাজদের বিরুদ্ধে, দুর্নীতি-অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে। তারুণ্যের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত ম্যারাথন চলবেই। যত বাধা, ভয়ভীতি আসুক আমরা থেমে যাব না।’
তিনি বলেন, ‘আগামীর নির্বাচনে কোনো ধরনের কারিগরি ষড়যন্ত্র জনগণ হতে দেবে না। জামায়াত নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুকূল্য চায় না। কিন্তু কমিশন যদি কারও প্রতি আনুকূল্য দেখায়, তবে তা বরদাশত করা হবে না। কালো টাকায় কেউ মানুষকে কেনার চেষ্টা করলে মানুষ মুখে ছাই মেরে দেবে।’
এ সময় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখন তারা পলাতক থেকে চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে। তাদের টার্গেট এখন এ দেশের তরুণ ও বিপ্লবীরা। সেই টার্গেটের অংশ হিসেবে তারা জুলাইয়ের অন্যতম শীর্ষ নেতা ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টা করেছে। ওসমান হাদির কিছু হলে বিপ্লবীরা বসে থাকবে না।’
ম্যারাথনের সমাপনী বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘গোটা জাতি যখন স্বাধীনতার জন্য নতুন বাংলাদেশ গড়ার অভিযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে ওসমান হাদির ওপর হামলা ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। গত ৫৪ বছর ধরে একটি আধিপত্যবাদী শক্তি আমাদের স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ উপভোগ করতে দেয়নি। যারা চায় না বাংলাদেশে আধিপত্যবাদের বিরোধী শক্তি নির্বাচনে জয়ী হোক, তারাই হাদির ওপর হামলার দায়ী।’ এ সময় তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে জনগণ আধিপত্যবাদের বিরোধী ইসলামি শক্তিকে তাদের ম্যান্ডেট দিয়ে সংসদে পাঠাবে।’
পরওয়ার বলেন, ‘পাকিস্তানের কাছে পরাজিত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে ১৯৭১ সালে ভারত আমাদের পেছনে দাঁড়ায়। তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। জগজিৎ সিং অরোরার কাছে জেনারেল নিয়াজিকে কেন আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল, সেই ইতিহাস জানতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রমুখ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে ম্যারাথনে অংশগ্রহণকারী জামায়াত নেতাকর্মীরা শাহবাগ-সায়েন্সল্যাব হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে ম্যারাথন শেষ করেন।