জড়িতদের শনাক্তে গোয়েন্দারা

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় দেশ জুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও ছায়ানট কার্যালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়েছে। ল্টুপাটও হয়েছে। সাংবাদিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হামলাকারীদের জিম্মি হয়ে পড়েছিলেন। আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসকে ঘটনাস্থলগুলোতে যেতে দেওয়া হয়নি। হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরব ভূমিকায় প্রশ্ন উঠেছে।

হামলার ঘটনায় দেশ-বিদেশে সমালোচনায় ঝড় বইছে। প্রধান উপদেষ্টা দুটি পত্রিকার সম্পাদককে ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। হামলাকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হামলার দায় কেউ নিচ্ছে না। রাজনৈতিক দলের নেতারা এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার প্রকাশ করা হয়নি। এগুলোর অনলাইন পোর্টালও বন্ধ ছিল।

পুলিশ সূত্র জানায়, ঘটনার পর থেকে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছে একাধিক  গোয়েন্দা সংস্থা। বিভিন্ন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও স্টিল ছবি সংগ্রহ করা হচ্ছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। হামলা ও লুটপাটের ঘটনার আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও (সিআইডি)। এসব ঘটনা পরিকল্পিত কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ভোর রাতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাঠে রয়েছে সাদা পোশাকের পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি সদস্যদেরও। বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করেছেন পুলিশের আইজি বাহারুল আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর বৃহস্পতিবার রাতে ডেইলি স্টার ভবনের বাইরে বিক্ষোভকারীদের হাতে  হেনস্তার শিকার হন। তাকে ‘আওয়ামী লীগের সহযোগী’ বলে অপবাদ দেওয়া হয়। তার চুল টেনে ধরা হয়।

যেসব স্থানে হামলা ও আগুন : জানা গেছে, বৃহস্পতিবার হাদির মৃত্যুর খবরের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। রাত সাড়ে ১১টার পর খুলনা ও চট্টগ্রামে ভারতের উপ-হাইকমিশন কার্যালয়ে হামলা, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ঢাকার প্রধান কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, ধানম-ি ৩২ নম্বরে আবারও অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, ছায়ানটের কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ইন্দিরা গান্ধী কালচালার সেন্টারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, উত্তরাতে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ; রাজশাহী ও কুষ্টিয়াতে ডেইলি স্টার-প্রথম আলোর স্থানীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর; চট্টগ্রামে প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় পুনরায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর; সাবেক মন্ত্রী বীর বাহাদুরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। হামলাকারীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লুটপাটও চালায়। বিষয়টি নিয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনা হচ্ছে।

নড়েচড়ে বসেছেন নীতিনির্ধারকরা : পুলিশের সূত্রমতে, দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার পর নড়েচড়ে বসেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। হামলাকারীদের চিহ্নিত করতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় সিআইডির ফরেনসিক বিভাগকে। কাজ শুরু করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব ও সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিট।

হামলা-ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনার পর বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত ও ইনকিলাব মঞ্চ নিন্দা জানিয়ে দ্রুত মব সৃষ্টির প্রয়াশ পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে হামলাকারীরা কারা। তারা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে দেড়শতাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। যাদের বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে দেখা গেছে। ঘুরেফিরে এরাই বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও হামলা চালাচ্ছে। সরকার চাইলে তাদের আইনের আওতায় নেওয়া সম্ভব।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনায় আমরাও বিব্রত। এসব ঘটনার সঙ্গে তৃতীয় কোনো পক্ষ সম্পৃক্ত বলে আমরা তথ্য পাচ্ছি। আমরা জড়িতদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করেছি। ছবি ও ফুটেজ সংগ্রহ করছি। তাদের চিহ্নিত করতে পারলে হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশ করা হবে। মব সৃষ্টিকারীদের প্রতিরোধ করা হবে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতায় প্রশ্ন : পত্রিকা দুটিতে হামলার সময় সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেননি বলে অভিযোগ করেছেন সংবাদকর্মীরা ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন। এ নিয়ে সুশীল সামাজের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। সংবাদকর্মীরা জানান, হামলার ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই। দুটি পত্রিকার সংবাদকর্মীদের নিবৃত করার কথাও বলছে পুলিশ। কর্মরত সাংবাদিকরা বলেন, ‘হামলার সময় পুলিশ চেয়ে চেয়ে দেখেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে গণমাধ্যমকর্মীরা আটকা পড়লেও পুলিশ তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেনি। সে সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ক্যশৈন্যু মারমা বলেন, ‘আমাদের আর কী করার আছে? হামলাকারীদের নিবৃত করার চেষ্টা তো করছি।’ ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যদেরও দেখা গেছে। ছায়ানটে হামলার সময়ও পুলিশকে প্রতিরোধ করতে দেখা যায়নি। 

সরেজমিনে যা দেখা গেছে : বৃহস্পতিবার রাতে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও আগুনের পর থেকেই রাজধানী জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে বিভিন্ন সড়কে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার ও শাহবাগ এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর কিংবা শাহবাগ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি সেভাবে চোখে পড়েনি। ছায়ানটের সামনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ধানমন্ডি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) খলিলুর রহমান বলেন, ‘সকাল থেকে আমরা এখানে আছি। অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি।’ দুপুরে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শন করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। তাকে প্রশ্ন করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) নজরুল ইসলাম বলেছেন, বৃহস্পতিবার রাতে নানা পরিস্থিতির কারণে বাধা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আর যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি : পুলিশের পাশাপাশি যৌথবাহিনীর চলমান অভিযানের মধ্যেও রাজধানীসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশ জুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর ভেঙে পড়া পুলিশ এক বছরের মাথায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কর্মরতদের জিম্মি করে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে ফের পুলিশ বাহিনী নিষ্ক্রিয়তার পরিচয় দিয়েছে। অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি, ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যেই ঘটে চলেছে। টার্গেট কিলিং, দখল আর চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটছে।

রুটিন ওয়ার্কের বাইরে পুলিশ কোনো কাজ করে না : ব্যাপক রদবদল, গণহারে বরখাস্ত ও সংযুক্তির ঘটনায় কিছুদিন সক্রিয়তা দেখালেও পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি তারা। রুটিন ওয়ার্কের বাইরে পুলিশ কোনো কাজ করছে না। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এখনো ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা। লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে তল্লাশি ও টহল কার্যক্রমও জোরদার করা যাচ্ছে না।

নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ : হামলার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রথম আলোর কার্যালয়ে সমাবেশ করে নাগরিক সমাজ। এর আগে তারা ডেইলি স্টার ও ছায়ানট ভবনের সামনেও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে যে হামলা দেখা গেছে, সেই হামলা পরিকল্পিত। এটি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত। এই অপরাধীদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।