আসামিদের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটির লেনদেন

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকা-ে মূল অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসা ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী অর্থ পাচারসংক্রান্ত পৃথক অনুসন্ধান শুরু করেছে সিআইডি।

এদিকে গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, হাদি হত্যার মূল সন্দেহভাজন ফয়সাল করিমের অবস্থান দেশে না বিদেশে সেই বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির তরফে বলা হয়, ফয়সালকে ধরার ব্যাপারে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া হাদি হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি ফয়সালকে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত।

সিআইডি জানায়, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে এসব অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব লেনদেন মানিলন্ডারিং, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ওসমান হাদি মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই ঘটনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে ছায়াতদন্ত শুরু করা হয়। দ্রুত ঘটনাস্থলে ক্রাইম সিন ইউনিট পাঠানো, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, ব্যবহৃত গুলির খোসা উদ্ধার এবং বিভিন্ন আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া ব্যাংক হিসাব-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে মানিলন্ডারিং অনুসন্ধান শুরু করা হয়। গ্রেপ্তার অভিযানের সময় উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবইয়ের তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অভিযুক্ত ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের একাধিক চেকবইয়ে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থের উল্লেখ রয়েছে। যদিও এসব লেনদেন চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয়নি, তবে এসব রেকর্ডের সমষ্টিগত মূল্য প্রায় ২১৮ কোটি টাকা।

সিআইডির প্রাথমিক বিশ্লেষণে আরও উঠে আসে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোতে বাস্তবে সংঘটিত লেনদেনের পরিমাণ ১২৭ কোটি টাকার বেশি, যা অস্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আমলে নিয়ে মানিলন্ডারিংসংক্রান্ত পৃথক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এ ছাড়া মূল অভিযুক্ত ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ৬৫ লাখ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার জন্য দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। একই সঙ্গে এসব অর্থের প্রকৃত উৎস ও অর্থ সরবরাহকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। হত্যাকা-ের পেছনে পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহে কোনো সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল কি না, সে বিষয়েও সিআইডির একাধিক তদন্ত দল কাজ করছে বলেও জানানো হয়।

হাদির মূল সন্দেহভাজন ফয়সাল দেশে আছেন নাকি বিদেশে এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি রফিকুল ইসলাম বলেন, ফয়সাল দেশে নাকি দেশের বাইরে, এটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছি। সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত আছে। ফয়সালের বাবা-মা, স্ত্রীসহ এ পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছে অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। যেসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, তার মধ্যে একটি হাদি হত্যাকান্ডে ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ছাড়া যে মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হয়েছে, সেটির পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারের কথাও জানান তিনি।

এ হত্যাকা- রাজনৈতিক না ব্যক্তিগত, গত কদিনের তদন্তে কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির অতিরিক্তি কমিশনার ডিবিপ্রধান শফিকুল বলেন, রাজনৈতিক কারণে এ হত্যাকা- বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্ত চলছে।

র‌্যাব কর্মকর্তা ইন্তেখাব বলেন, আটক ব্যক্তিদের কাছ যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তা হচ্ছে ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার পর ফয়সাল ও আলমগীর (মোটরসাইকেল চালক) আগারগাঁও যায় এবং হত্যাচেষ্টায় ব্যবহৃত পিস্তল ও গোলাবারুদ লুকানোর পরিকল্পনা করে। অস্ত্রের ব্যাগটি সে তার বাবাকে দিয়ে শ্যালক শিপুর কাছে হস্তান্তর করতে বলে এবং সে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সাভারের উদ্দেশে রওনা দেয়। পরে ফয়সালের বাবা ব্যাগটি শিপুর কাছে দেন। শিপু নরসিংদীতে গিয়ে তার বোন, অর্থাৎ ফয়সালের স্ত্রী সামিয়ার কাছে অস্ত্রের ব্যাগটি দেয়। পরে সামিয়া ব্যাগটি শিপুকে লুকানোর জন্য বললে শিপু তার বন্ধু ফয়সালের বাসায় সেটি রাখার জন্য দেয়।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, পরে বিভিন্নভাবে হাদিকে গুলি করার বিষয়টি প্রচারিত হলে ভয় পেয়ে পার্শ্ববর্তী তরুয়ার বিলে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ব্যাগটি ফেলে দেওয়া হয়। সেখান থেকেই পরে র‌্যাব সেগুলো উদ্ধার করে বলে জানান তিনি।

বিজিবি সদস্য সেক্টর কমান্ডার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনার পর তারা সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেন। মানব পাচারে সহায়তার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সীমান্ত এলাকায় অন্যতম মানব পাচারকারী ফিলিপকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এ মামলার গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির ও মা হাসি বেগম, স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা ও শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু, রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ী মো. মুফতি নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, ফয়সালের সহযোগী মো. কবির, সিবিউন দিউ ও সঞ্জয় চিসিম। তাদের মধ্যে হুমায়ুন ও হাসি দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। রিমান্ড শেষে নুরুজ্জামানকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিরা রিমান্ডে রয়েছেন।

হাদির সমাধিস্থলের ছড়িয়ে পড়া ছবিটি ভুয়া : হাদির সমাধিস্থল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একটি ছবি। ছবিটি বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, হাদির সমাধিস্থলটি নিরাপত্তাবেষ্টিত এবং এ নিয়ে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সর্বসাধারণকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এর আগে গত শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদসংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধের পাশেই শরিফ ওসমান হাদিকে দাফন করা হয়।

জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। দেশে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাতে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।