আওয়ামী লীগের শাসনামলে র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম করে নির্যাতনের অভিযোগের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কারাগারে থাকা ১০ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই সঙ্গে এ মামলায় প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য ও আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল। র্যাবের ওই সেলে ১৪ জনকে নির্যাতন গুম করার ঘটনায় ১৭ আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
গতকাল এ মামলার শুনানিতে আসামিপক্ষের সময়ের আবেদন নিয়ে ট্রাইব্যুনালে উত্তাপ ছড়ায়। পক্ষে-বিপক্ষে বাহাসে জড়ান চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও আসামিপক্ষের আইনজীবী ড. তাবারক হোসেন। একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে ট্রাইব্যুনাল। আসামিপক্ষের আইনজীবীকেও যথানিয়মে শুনানি করতে বলে আদালত। এ মামলায় ১৭ আসামির মধ্যে কারাগারে থাকা ১০ সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।
আওয়ামী লীগের সময়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুমের ও নির্যাতনের ঘটনায় শেখ হাসিনা ও ১১ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে গত ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠন করে গণঅভ্যুত্থান দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদ- দেয় এ ট্রাইব্যুনাল।
টিএফআই সেলে নির্যাতনের মামলায় গতকাল ১০ সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। অভিযোগ পড়ে শুনিয়ে বেঞ্চের বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী আসামিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা দোষী না নির্দোষ?’ ১০ সেনা কর্মকর্তা তখন উঠে দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, ‘আমরা নির্দোষ। ন্যায়বিচার চাই।’ এর মধ্যে কাঠগড়ায় সামনের সারিতে থাকা একজন সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করি, এ মহান আদালতে আমরা ন্যায়বিচার পাব।’
শুনানিতে উত্তাপ : অভিযোগ গঠনের পর আসামি পক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন শুনানির প্রস্তুতিতে তিন মাস সময়ের আবেদন করেন। তিনি এও বলেন, অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ (আদেশ পুনর্বিবেচনা) আবেদন করবেন তিনি। সে সময় ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ বলেন, ‘আপনি যদি রিভিউতে ইন্টারেস্টেড থাকেন তাহলে করতে পারেন।’
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম আসামিপক্ষের এ আরজিতে আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের আইনে অভিযোগ গঠনের পর ২১ দিন সময় পাওয়া যায়। তারা আরও সময় চাচ্ছেন। এ জন্য কি ট্রায়াল (বিচার) বসে থাকবে?’
সে সময় বিচারক শফিউল আলম মাহমুদ চিফ প্রসিকিউটরের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা এখনো অ্যালাউ (রিভিউ আবেদন) করিনি। আমরা কোনো আদেশ দিলে বা কথা বললে আপনি অপিনিয়ন (মতামত) দিতে পারেন। কিন্তু এভাবে কথা বলতে পারেন না।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমি কী বললাম?’
বিচারক বলেন, ‘ডিফেন্স (আসামিপক্ষের আইনজীবী) কথা বললেই আপনি দাঁড়িয়ে যান। আমরা তো আমাদের মতামত দিতে পারি। আমরা তো এখনো ফাইনাল অর্ডার দিইনি।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা কোনো প্রেজুডিস (অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত) চাই না। যারা এসব ঘটনার (গুম) ভুক্তভোগী তাদের তো বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।’
বিচারক বলেন, ‘এখানে কোনো প্রেজুডিস হচ্ছে না। আপনি এমন কিছু বলবেন না যাতে আদালত প্রেশারাইজড (চাপ প্রয়োগ) হয়।’
প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম বিচারকদের উদ্দেশে বলেন, ‘মাঝেমধ্যে বিষয়গুলো (বিচারকদের মতামত) আদেশের মতো মনে হয়। এ জন্যই আমরা আইনের মধ্য থেকে বিরোধিতা করি। আমাদের তো কাজ করতে দিতে হবে।’
সে সময় আইনজীবী তাবারক হোসেন রিভিউ আবেদনের জন্য ১৫ দিনের সময়ের আরজি জানান। জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, ‘এটা তো ১৫ মিনিটের কাজ। আপনি পুরো মামলার নথি পড়বেন না কি রিলেটেড অংশগুলো পড়বেন? এভাবে চললে মাসের পর মাস সময় লাগবে।’
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘তারা (আসামিপক্ষ) ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমকে যেভাবেই হোক বিলম্ব করতে চাচ্ছে। এটার উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এই ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের হত্যা করা হচ্ছে। চাকু মারা হচ্ছে। সাক্ষীরা একটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তারা (আসামিপক্ষের আইনজীবী) বাইরে গিয়ে বলেন, ‘এখানে (ট্রাইব্যুনালে) আর্মির (সেনাবাহিনী) বিচার হচ্ছে। অথচ যাদের বিচার হচ্ছে ঘটনার সময় তারা আর্মির পোশাকে ছিলেন না। র্যাবের দায়িত্বে ছিলেন। এভাবে আর্মিকে ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি করা হচ্ছে।’
ট্রাইব্যুনালের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, ‘এখানে সেনাবাহিনীর বিচার হচ্ছে না।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘বিচার ডিলে (বিলম্ব) করার জন্য আসামিপক্ষ এসব করছে।’
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা বিচার ডিলে করব না।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘সাক্ষীদের মেরে ফেললে আমরা বিচার করব কীভাবে?’
আইনজীবী তাবারক হোসেন চিফ প্রসিকিউটরের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘এখানে আর্মিদের বিচার হচ্ছে এমন কোনো কথা আমি বলিনি। আমি বলেছি সেনা কর্মকর্তাদের বিচার হচ্ছে।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমার কাছে রেকর্ড আছে।’
তারাবক হোসেন বলেন, ‘উনি (চিফ প্রসিকিউটর) বিচার নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন?’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা তাড়াহুড়ো করছি না।’
তাবারক হোসেনের উদ্দেশে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আপনি দাঁড়ালেন কেন? বসেন।’ বিচারকও আইনজীবীকে বসতে বলেন। এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল শুনানি করতে চার সপ্তাহের সময় মঞ্জুর করে।
তারিখ ধার্যের পর তাবারক হোসেন আবারও উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘চিফ প্রসিকিউটর আমাকে বসতে বলতে পারেন না। আমি উনার সিনিয়র। ট্রাইব্যুনাল আমাকে বসতে বলতে পারে। আপনি (চিফ প্রসিকিউটর) পারেন না। আমি কথা বললে উনি পেছন থেকে ডিক্টেট করেন। এটা উনি করতে পারেন না।’
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘উনি (চিফ প্রসিকিউটর) কিছু রিপ্লাই দিয়েছেন।’
তারিখ ধার্যের পর বেঞ্চের সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ উভয়পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে হাস্যোচ্ছলে বলেন, ‘আপনারা কি আমাদের হ্যাপি নিউ ইয়ারও পালন করতে দেবেন না?’ সে সময় চিফ প্রসিকিউটর হাস্যোচ্ছলে বলেন, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ারের জায়গায় হ্যাপি জানাজা হয়ে যায় কি না বলা তো যায় না।’
টিএফআই সেলে গুমের মামলায় কারাগারে থাকা ১০ সেনা কর্মকর্তা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো. কামরুল হাসান, মো. মাহাবুব আলম ও কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম সুমন ও মো. সারওয়ার বিন কাশেম। শেখ হাসিনা, তার সাবেক সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজির আহমেদ, র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশীদ হোসেন, হারুন অর রশীদ ও র্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. খায়রুল ইসলামসহ সাতজন এখনো পলাতক।
জিয়াউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন নিয়ে শুনানি ৪ জানুয়ারি : আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল জিয়াউলকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। প্রসিকিউশন পক্ষে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী এ মামলায় জিয়াউলকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করে ৪ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির জন্য রাখে।