মাংসপেশি শুকিয়ে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছিলেন তিনি

কারা অধীনে চিকিৎসার জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে যখন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (আগের পিজি) নিয়ে আসা হয়, তখন তার শারীরিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। আসছিলেন সাংঘাতিক কোমর ব্যথা নিয়ে। বাম পায়ে ভর দিতে পারছিলেন না। সাময়িক কিছু চিকিৎসা দিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে যেতে চাইছিল। নানা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত তাকে ভর্তি করা হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বড় সন্তানকে রাখা হয় ডি ব্লকের কার্ডিওলজি বিভাগের বারান্দার ছোট কেবিনে। ৪০১ নম্বর ওই কেবিনে তারেক রহমানের আগে ভর্তি ছিলেন বিএনপির সাবেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) প্রয়াত আ স ম হান্নান শাহ। তিনি তারেক রহমানের ভর্তির জন্য কেবিনটি ছেড়ে দেন। ভর্তির পর তার বাম পায়ের মাংসপেশি শুকিয়ে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে তিনি পঙ্গু হয়ে যাচ্ছিলেন। যে ধরনের চিকিৎসা দরকার ছিল, তা তিনি পাচ্ছিলেন না। তখন বিদেশ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। তাতে নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়। পরে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাকে লন্ডনে নেওয়া হয়। সেখানে ৪-৫ বছরের চিকিৎসায় তিনি সুস্থ হন।

তখন তার চিকিৎসায় সরাসরি যুক্ত ছিলাম। এমনকি লন্ডনেও তার সঙ্গে গিয়েছিলাম। যখন পিজিতে তারেক রহমানকে নিয়ে আসা হয়, ভর্তি না করিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু হাসপাতালে আসার পর এক্স-রে করলাম। তাতে দেখা যায়, মেরুদন্ডে যে ১২টি ভার্টিকুলার থাকে তার মধ্যে ৮-৯ এর মাঝের স্পেস কমে গেছে। যে কারণে এমআরআই করানো হয়। এমআরআই করিয়ে তখন পরিষ্কার দেখা গেল ইন্টার ভার্টিব্রাল ডিস্ক চেপে গেছে।

এখন প্রশ্ন হলো ডিস্কে এই সমস্যা কেন হয়? অনেক ভারী জিনিস তুললে, দুর্ঘটনায় বা উপর থেকে পড়ে গেলে এমন হতে হতে পারে। যেকোনো রোগী এলে সাধারণত তার এমন ইতিহাস নেওয়া হয়। তখন উনি (তারেক রহমান) বলছিলেন, প্রায় ১৫ ফুট উপর থেকে পড়ে গেছেন। উনি তো আর নিজে নিজে পড়েননি। ওনাকে হয়তো বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল, সেখান থেকে হয়তো পড়ে গেছেন বা ফেলে দিয়েছে। সেইভাবে তিনি আঘাত পেয়েছেন। তখন তো ওই পরিবেশে তিনি আমাদেরও খোলামেলা কিছু বলেননি। যতটুকু বলেছেন ‘উপর থেকে পড়ে গেছেন।’

এমন গুরুতর অবস্থা ছিল যে তাকে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা করানো দরকার। প্রথমে কারা কর্তৃপক্ষ মানতে নারাজ। আমি বললাম, রোগী নিয়ে গেলে ‘রিক্স বন্ড’ দিয়ে নিয়ে যান, যে এই রোগীর চিকিৎসা আমরা ওইভাবে করাব। পরে কারা কর্তৃপক্ষ আর ঝুঁকি নেয়নি। এবার সামনে এলো আরেক সমস্যা। শয্যাসংকট। ভর্তির মতো কোনো কেবিন নেই। ওই সময়ে দুটি কেবিনে বিএনপির দুইজন নেতা ভর্তি ছিলেন। একটি কেবিন ছেড়ে ছুটি নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য তাদের সঙ্গে আলাপ করা হলো। যাতে ওই শয্যায় তারেক রহমান থাকতে পারেন। দুজনের একজন কোনোভাবেই রাজি হলেন না। হান্নান শাহকে বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এক কথায় রাজি হয়ে শয্যা ছেড়ে দিলেন। বললেন, ‘একটু সময় দাও। আমি গুছিয়ে নেই’। আমি নিজে তার সঙ্গে কথা বলি। তিনি রাজি হওয়ায় তখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বললাম, আমরা ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করি। তখন আর কারা কর্তৃপক্ষের কোনো উপায় ছিল না, এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার। অন্যরা কিছুটা ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু আমি বলছি না, এই রোগীকে এভাবে ছাড়ব না। নিতে হলে আপনারা ‘রিক্স বন্ড’ দিয়ে নিয়ে যান, যে এই রোগীর চিকিৎসা আমরা ওই ভাবে করাব। ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে । এভাবে হবে না।

নিরাপত্তার জন্য তাকে কেবিন ব্লকে রাখা হয়নি। কারণে কেবিন ব্লকটি একেবারেই সড়কের সঙ্গে। প্রতিদিন-সকাল সন্ধ্যা চিকিৎসকরা তাকে দেখতেন। আমি তিনবেলাই তাকে দেখতে যেতাম, ওষুধ পথ্য আমিই নিয়ে যেতাম। কিছুদিন গেলে দেখা গেল তার বাম রানের মাংসপেশি শুকিয়ে যাচ্ছিল। দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। এক্সটেনসিভ ফিজিওথেরাপির দরকার ছিল। ভিআইপি রোগী ডি ব্লক থেকে সি ব্লকের নিচতলায় নিয়ে ফিজিওথেরাপি দেওয়া, আর ডি ব্লকে নিয়ে আসা, আমরা ডি ব্লকে কয়েকদিন দিছিলাম, দেখলাম লাভ হচ্ছে না। এই সব মিলিয়ে সমন্বিত চিকিৎসা আসলে সম্ভব হচ্ছিল না। শুধু আমার চিকিৎসা না যে, বললেই কোনো রকম একটা হলে হলো। ওনার সঠিক যে চিকিৎসা দরকার ছিল, সেজন্য আমরা দেশের বাইরে নেওয়ার পরামর্শ দেই। যাদের সামর্থ্য আছে তারা তো অল্প জ¦র হলেও সিঙ্গাপুর যান। যেহেতু তিনি একজন রাষ্ট্রপতি এবং একজন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে। তিনি নিজেও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। ওনার আসলে বাইরে চিকিৎসা প্রয়োজন।

এই প্রয়োজনীয় বিষয়টি যাতে আমরা না লিখতে পারি, সেজন্য তৎকালীন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা আমাদের নানাভাবে চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দিল তার বাইরে যাওয়া দরকার। তা না হলে ধীরে ধীরে পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন। পার্শিয়ালি প্যারালাইজড। এটা বলায় তখন হইচই পড়ে যায়। এটা বলায় আমাকে পরে অনেক সাফার করতে হয়েছে। চাকরি যাওয়া থেকে শুরু করে নানা কিছু। তখন আমরা মেইল করে বিভিন্ন দেশে যোগাযোগ করি। আমাকে জিজ্ঞেস করছিল, কোথায় কোথায় এর ভালো চিকিৎসা হয়। আমি জানিয়েছলাম অর্থোপেডিক্সের ভালো চিকিৎসা জার্মানিতে হয়। এ ছাড়া লন্ডন, অমেরিকা, সৌদির নাম বলেছিলাম। পরে ভাষাগত সমস্যা সামনে এলো। জার্মানি গেলে আমরা জার্মানি ভাষায় কথা বলতে পারব না। এ নিয়ে চিন্তা করলাম। তখনই চিন্তা করলাম লন্ডনে তো ইংরেজিতে কথা বলা সম্ভব। পরে আমরা লন্ডন বেছে নিলাম। সৌদির নাম বলার কারণ, সেখানে আমার জন্ম। আমি ওখানকার চিকিৎসা সম্পর্কে জানতাম। বেশ উন্নত। পরে সবাই মিলে ঠিক করলাম লন্ডনই ভালো হবে যদি যেতে পারি।

আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে সরকার রাজি হচ্ছে না। আমরা বললাম আপনারা আলাদা মেডিকেল বোর্ড করে দেখেন। তারাও বোর্ড করে দেখল, আমি মিডিয়াতে যা বলেছি সবই সত্য। ওই মেডিকেল বোর্ড সরকারকে পরে প্রতিবেদন দেয়। আমরা আদালতেও এটা দাখিল করি। অনুমতি পেয়ে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান। ম্যাডাম মুক্তি পান ৯ সেপ্টেম্বর। আমরা ১১ সেপ্টেম্বর এখান থেকে মুভ করি। লন্ডনে ভর্তির পর এক্সটেনসিভ ফিজিওথেরাপি দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে তিনি সুস্থ হন। সুস্থ হতে প্রায় ৪-৫ বছর লাগে।

আমি ওনার সঙ্গে লন্ডন গেলাম। হঠাৎ করে যাওয়া। দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি দেড় মাস পরে আসি। দেরি হচ্ছে তা আমি ভিসি স্যারকে জানিয়েছিলাম। আমি বিষয়টা ওভাবে নেইনি। আমার কাছে তার চিকিৎসাটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেশে আসার পরে ‘ওভার স্টে’ করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করে। ইকবাল সোবহানের নেতৃত্বে করা হয় কমিটি। আওয়ামী লীগ সরকার চলে এলো ক্ষমতায়। আমাকে হয়রানি শুরু করল। আমার রুমে এসে হুমকি ধমকি দিল, অস্ত্র দেখাল। মেরে ফেলবে। একদিন সকালে কাগজপত্র নিয়ে এসে সাইন করিয়ে নিয়ে গেল। এতে আওয়ামীপন্থি ডাক্তাররা জড়িত ছিলেন। বের হয়ে আমি শাহবাগ থানায় গিয়ে জিডি করে বাসায় চলে যাই। এটা ২০১১ সালে ১ জানুয়ারি। পরে শাহবুদ্দিন মেডিকেল কলেজে জয়েন করি। ভাইস প্রিন্সিপাল হলাম। আবার ১৪ বছর ৩ মাস পরে চাকরি ফেরত পাই। কিন্তু এখনো সিনিয়রিটি পাইনি। এর মধ্যে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। গত বছর হার্ট অ্যাটাক হয়।