ক্যামেরা হাতে এক দীপ্ত নারী

বাংলাদেশের নারী জাগরণে যাদের অবদান অনস্বীকার্য তাদের মধ্যে আলোকচিত্রী ও সাহিত্যিক সাইদা খানমের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যখন কোনো পত্রিকায় পেশাদার আলোকচিত্রী ছিলেন না তখন তিনিই দেশের স্বনামধন্য ম্যাগাজিনের জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিয়মিত ছবি তুলতে শুরু করেন। তিনি ছিলেন গোটা পাকিস্তানের প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নারী আলোকচিত্রী। দীর্ঘজীবনে তিনি বাংলাদেশের ঘটনাবহুল সময়ের নানা ছবি তুলেছেন। ফলে তার ক্যামেরা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কথাকার। তৎকালীন সমাজের নানা বাধার প্রাচীর ভেঙে তিনি নারী আলোকচিত্রীদের জন্য নির্মাণ করেছেন চলার পথ। তিনি ছিলেন সে সময়ের আধুনিক প্রগতিশীল নারীর দৃষ্টান্ত। কবি ও সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন, ‘ষাটের দশকে সাইদা খানমকে আমার মনে হতো সবচেয়ে আধুনিক। কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে সারা শহর ঘুরে ছবি তুলত।’ তার এই স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বছন্দ পদচারণা অনেক নারীকেই আলোকচিত্র চর্চায় বা নিজের পছন্দ অনুযায়ী জ্ঞানচর্চা বা শিল্পচর্চায় উদ্বুদ্ধ করত। তিনি নিজেও অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা লাভ করেছেন অনেকের কাছ থেকে।

শৈশব ও শিক্ষাকাল

সাইদা খানম ১৯৩৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আবদুস সামাদ খাঁ এবং মায়ের নাম হাসিনা খাতুন। সাইদা খানমের মায়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয়। তখন হাসিনা খাতুনের অন্যান্য ভাইবোনরাও ছিলেন অনেক ছোট। সাইদা খানমের নানি অল্প বয়সে মারা যাওয়ায় ভাইবোনদের দেখাশোনার জন্য মা হাসিনা খাতুন নানাবাড়িতেই বাস করতে শুরু করেন। সাইদা খানমের শৈশব নানাবাড়িতেই কাটে। নানা খান বাহাদুর মুহম্মদ সোলায়মান সিদ্দিক ছিলেন খ্যাতিমান সহৃদয়বান মানুষ। মাত্র ৪০ বছর বয়সে বিপতœীক হলেও সন্তানরা কষ্ট পাবে জেনে দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। তবে তিনি সমাজের মানুষ কী ভাববে সেটিও মাথায় রাখতেন। সে কারণে হাসিনা খাতুন যখন ১২ বছর পূর্ণ করলেন তখন পড়াশোনা থেকে ছাড়িয়ে ঘরে এক প্রকার বন্দি করেই রাখেন। এমনকি খুব অল্প বয়সে তার আরেক কন্যা মাহমুদা খাতুনকে বিয়ে দেন। তবে এই বিয়ের ফল ভালো হয়নি। মাহমুদা খাতুন এই বিয়েকে মেনে নেননি। তিনি বাবার বাড়িতেই বাস করতেন। মা হাসিনা খাতুন ও খালা মাহমুদা খাতুন (যাকে সাইদা খাতুন কবি খালা বলতেন) সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। তার নানাও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পড়তেন। ফলে বাড়ি থেকে বাইরে বের হওয়ার কড়াকড়ি থাকলেও পত্র-পত্রিকার কল্যাণে সাহিত্যাবহ ছিল। কবি খালা বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন।

সাইদা খানমের শিক্ষাজীবন সাবলীল ছিল না। তিনি ছোটবেলায় নানা রোগে ভুগতেন। সে কারণে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারতেন না। তবে সাইদা খানম নিয়মিত স্কুলে যেতে না পারলেও শিক্ষাজীবনে তার কোনো প্রভাব ফেলেনি। প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে পাস করে বিভিন্ন শ্রেণিতে উঠেছেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষাও তিনি প্রাইভেটে দিয়েছিলেন। পরে আইএ-তে ভর্তি হলেও নিয়মিত ক্লাস করতে পারেননি। তিনি প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন। কিন্তু সেখানেই থেমে যায়নি মেজো বোনের কথায়। তিনি বলেছিলেন, বিএ পাস না করলে কেউ সম্মান করবে না। তিনি প্রাইভেটে বিএ পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ভর্তি হন এবং পরবর্তী সময়ে পাস করেন। পরে লাইব্রেরি সায়েন্সে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

ক্যামেরার সঙ্গে প্রথম দেখা

কবি খালা প্রগতিশীল মনমানসিকতার ছিলেন। তিনি সাহিত্যচর্চা করতেন। সে সময়ের সবকটি বিখ্যাত পত্র-পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হতো। তিনি মাঝে মাঝে বাড়িতে ক্যামেরা এনে ছবি তোলাতেন। সে সময়ের কালো কাপড়ে ঢাকা বিশাল ক্যামেরাই সাইদা খানমের দেখা প্রথম ক্যামেরা। তার মাও বই পড়তে, থিয়েটার দেখতে পছন্দ করতেন। মায়ের সঙ্গে থিয়েটার দেখতে দেখতে ফ্রেমের সঙ্গে তার প্রেম। ক্যামেরার সঙ্গে দ্বিতীয়বার অন্যরকমভাবে পরিচয় হয় ঘটে রাঁচিতে। নানার অসুস্থতার কারণে হাওয়া বদলের জন্য যখন তারা রাঁচিতে থাকতে বাধ্য হন সে সময় এক হিন্দু পরিবারের সঙ্গে তাদের সখ্য হয়। সে পরিবারের মেয়ে ইতু ছিল সাইদা খানমের বয়সী। তার সঙ্গে সাইদা খানমের বন্ধুত্ব হয়। তার বড় বোন মালতীদিও সাইদাকে স্নেহ করতেন। ইতুর ছিল দুই ভাই। বাদল ও ভুলু। ভুলু ভালো ছবি তুলতেন। সাইদারা ভুলুদাকে ধরেছিলেন ছবি তোলার জন্য। ভুলুদা তাদের বসিয়ে ক্লিক করেছিলেন বটে কিন্তু তার ক্যামেরায় ফিল্ম ছিল না। সেটি অবশ্য সাইদা খানমের বড় বোনকে জানিয়েছিলেন। এই অপূর্ণতা সাইদা খানমকে ক্যামেরার প্রতি আরও আকর্ষণ করতে থাকে।

হাওয়া পরিবর্তনের জন্য তাদের কিছুদিন গিরিডিতেও থাকতে হয়েছিল। সেখানে পরিচয় সুষমাদির সঙ্গে। তিনি খুব সুন্দর রবীন্দ্র সংগীত গাইতেন। তাদের ছিল একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। সুষমাদি তাকে দিয়েছিলেন একশর বেশি জীবনী গ্রন্থ। এই জীবনীগুলো পড়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বড় লেখিকা হবেন। বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী পড়ে ভাবতেন তাদের মতো মানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গ করবেন। স্কুলে নিয়মিত ক্লাস না করলেও প্রকৃতি ও এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগুলো গড়ে দিয়েছিল তার মজবুত ভিত।

সাইদা খানমকে প্রথম ক্যামেরা দেন লুৎফুননেসা চৌধুরী। তিনি ছিলেন সাইদা খানমের মেজো বোন হামিদা খানমের বন্ধু। এই ক্যামেরা দিয়ে হাতেখড়ি সাইদা খানমের ছবি তোলার। মেজো বোন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার সময় তার জন্য নিয়ে আসেন রোলিকর্ড ক্যামেরা। এই ক্যামেরায় তোলা একটি ছবিই তাকে আন্তর্জাতিক পুরস্কার এনে দেয়।

প্রথম পুরস্কার ও লেখা প্রকাশ

মাত্র ১২ বছর বয়সে সাইদা খানমের লেখা বেশ কয়েকটি গল্প বেগম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই সূত্রে কবি খালা তাকে বেগম পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা নাসিরউদ্দীনের কাছে নিয়ে যান। লেখার পাশাপাশি ছবি তোলে শুনে নাসিরুদ্দীন খুব খুশি হন। তাকে বেগম পত্রিকার জন্য প্রচ্ছদ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি তোলার জন্য উৎসাহ দেন। তার এই উৎসাহেই সাইদা খানম আলোকচিত্র চর্চা চালিয়ে যান পূর্ণ উদ্যমে। ছবি তুলে সেগুলো প্রিন্ট করতে জায়েদী ফটোগ্রাফার্সে। এর মালিক ছিলেন ক্যাপ্টেন এ এইচ এম জায়েদী। একটি ছবি দেখে তিনি অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে ছবিটি নিখিল পাকিস্তান আলোকচিত্র শিল্প প্রতিযোগিতায় পাঠান। ছবিটি প্রথম পুরস্কার লাভ করে। দুই বছর পর আরেকটি ছবি পাঠান জার্মানির কোলনে অনুষ্ঠিত কোলন আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র ও সিনেমা প্রদর্শনীতে। সেখানে পুরস্কৃত হয় ছবিটি। এভাবেই সাইদা খানম হয়ে ওঠেন গোটা পাকিস্তানের প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নারী আলোকচিত্রী।

যাদের ছবি তুলেছেন

সাইদা খানম তুলেছেন প্রকৃতি ও মানুষের ছবি। তার অনেক ছবির মডেল হয়েছেন তার বোন ও ভাবি। ছবি তোলার সময় এদের দুজনের কাউকে বা দুজনকেই সঙ্গে নিতেন তিনি। তাছাড়া ছবি তুলেছেন বাড়ির অন্য সদস্যদের। বেগমের প্রচ্ছদের জন্য যেমন বিভিন্ন জায়গায় গেছেন তেমনি মডেলকে প্রস্তুত করে তুলেছেন ঘরের ভেতরেও। বেগমের আলোকচিত্রী ও চিত্রালীর বিশেষ প্রতিনিধি হওয়ার কারণে বাংলাদেশে বিখ্যাত ব্যক্তিদের কেউ এলেই ছবি তোলার আমন্ত্রণ পেতেন সাইদা খানম। এভাবেই তিনি ছবি তুলেছেন ব্রিটেনের রানির, চন্দ্রজয়ী তিন নভোচারীর, মাদার তেরেসার, জয়নুল আবেদিনের, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর, ওস্তাদ আকবর আলী খাঁর, সুফিয়া কামালের, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এবং অসামান্য প্রতিভাশালী চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়ের।

সত্যজিৎ রায়ের ছবি তোলার ঘটনাটি খুব মজার। কলকাতায় যেতে হতো তাকে প্রতিবছর। চিকিৎসার কারণে। একবার ভাবলেন, এবার গিয়ে সত্যজিৎ রায়ের ছবি তুলবেন। এ কথা চিত্রালীর সম্পাদককে জানালে তিনি মৃদু হেসেছিলেন। সাইদা খানম ভেবেছিলেন সম্পাদক তাকে একটু ব্রিফ করলে তিনি একটি সাক্ষাৎকারও নেবেন। কিন্তু সম্পাদক তাকে ব্রিফ করলেন না। সাইদা খানম তাতে না দমে কলকাতায় গিয়ে সত্যজিৎকে ফোন করে অ্যাপয়েনমেন্ট নিলেন। নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত হলে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্যজিৎকে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেন এবং তার ছবি তোলার অনুমতি চান। সত্যজিৎ তাকে অনুমতি দেন। ছবি তোলার সময় ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় বিজয়া রায় কী হলো জানতে এসে দেখেন একজন নারী আলোকচিত্রী সত্যজিতের ছবি তুলছেন। প্রথম দেখাতেই বিজয়া রায় তাকে পছন্দ করেন। আলাপ শেষে ফিরে আসার সময় বিজয়া রায় বলেন, তোমার অ্যাপয়েনমেন্ট লাগবে না। তুমি কলকাতায় এলেই বাড়িতে আসবে। এরপর তিনি অনেকবার সত্যজিতের বাসায় গিয়েছিলেন, সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, ছবি তুলেছেন। সত্যজিতের সেটে আলোকচিত্রীরা ঢুকতে পারত না। কিন্তু সেখানেও ছবি তোলার অনুমতি ছিল সাইদা খানমের। সত্যজিৎকে বিরক্ত না করে, ফ্ল্যাশ না জে¦লে নিজের মতো ছবি তুলতেন। সেসব ছবি নিয়েই পরে প্রদর্শনী করেছিলেন সাইদা খানম। প্রদর্শনীটি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিম-লের মানুষের প্রশংসা অর্জন করেছিল।

আক্ষেপ

আলোকচিত্রী হিসেবে সাইদা খানম খ্যাতিমান হলেও তার লেখাও সুধীজনদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। তিনি তিনটি উপন্যাসিকা, একটি গল্পগ্রন্থ, একটি দীর্ঘ উপন্যাস, একটি স্মৃতিকথা ও একটি গদ্য সংকলন সম্পাদনা করেন। কর্মসূত্রে তিনি ছিলেন বাংলা বিভাগের লাইব্রেরিয়ান। আর্থিক সংগতি ছিল বলে ফটোগ্রাফির জন্য বেতন নিতেন না, পথ খরচ বাবদ সামান্য কিছু অর্থ গ্রহণ করতেন। জীবদ্দশায় তার ছয়টি একক প্রদর্শনী হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন ঘটনা তার ক্যামেরায় ধরে রাখলেও মুক্তিযুদ্ধের সময় খুব বেশি ছবি তুলতে পারেননি। তবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করলে সেদিনের কিছু ছবি তোলেন তিনি। তবে সেদিনও এক ভয়ংকর গোলাগুলির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যামেরা নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার চিহ্ন ধরে রাখতে না পারা নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল।

আলোকচিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০১৯ সালে একুশে পদক পান। কিশোরীবেলায় বিপ্লবী গণেশ ঘোষ কয়েকবার চিঠি লিখে তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে। শেষবেলায় এসে সাইদা খানম বলতেন, ‘দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারিনি। তবে আমি আমার ক্যামেরা দিয়ে এ দেশের মানুষের সুখ-দুঃখ আর ভালোবাসা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’ একই সঙ্গে বলতেন, ‘আমার ছবি তোলা সার্থক হয়নি। আরও ভালো ছবি তোলা উচিত ছিল, যা আমি তুলতে পারিনি। এ অতৃপ্তি নিয়ে আমাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে।’ ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট অনন্তলোকের যাত্রী হন এই আলোকচিত্রী। তার জীবন আজও লাখো নারীর অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছে।

লেখক : প্রাবন্ধিক