রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অফিস করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি এবারই প্রথমবারের মতো গুলশানের এই কার্যালয়ে এলেন। এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য এই কার্যালয় খোলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তারেক রহমানের গুলশানের অফিসে যাওয়ায় দলের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশে তিনি সফর করবেন। সেই প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
গতকাল রবিবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের গাড়ি গুলশানের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রবেশ করে। এর আগে তিনি গুলশান অ্যাভিনিউয়ের বাসভবন থেকে এই কার্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হন।
কার্যালয়ে পৌঁছালে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ^র চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার ফুল দিয়ে তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানান।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, মিডিয়া সেলের সদস্য শাম্মী আক্তার, আতিকুর রহমান রুমন, আবু সায়েম, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহাদী আমিন প্রমুখ।
গাড়ি থেকে নেমে উপস্থিত সবার সঙ্গে শুভেচ্ছাবিনিময় শেষে তারেক রহমান কার্যালয় ভবনে প্রবেশ করেন। পরে কার্যালয়ের দোতলায় নিজের জন্য নির্ধারিত কক্ষে গিয়ে বসেন এবং দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
পরে সাংবাদিকদের ড. খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘আসার পর এই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রথম অফিস করলেন। নির্বাচন বিষয়ে নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ ছাড়া দলের সাংগঠনিক বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে।’
আমীর খসরু বলেন, ‘দলীয় কার্যালয়ে তারেক রহমানকে পেয়ে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছেন। নির্বাচন ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি যাত্রা করবেন। দেশের মানুষ যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন, তারেক রহমানের আগমনে তা পূরণ হবে।’
গয়েশ্বর চন্দ্র মন্তব্য করেন, তারেক রহমানের আগমন দলের মনোবল অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে।
রুহুল কবির রিজভী যোগ করেন, তারেক রহমানের গুলশান কার্যালয়ে আগমন দলকে নতুন উদ্দীপনা দেবে।
বিএনপি সূত্র জানায়, দলীয় ও সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে খোঁজখবর নিতেই তারেক রহমান কার্যালয়ে আসেন। শিগগিরই তিনি নির্বাচনী সফর শুরু করবেন। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মিডিয়া সেল থেকে দেওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, তারেক রহমান দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। সেখানে তিন দিন তার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। এতে তার শারীরিক অবস্থা নিয়েও নেতারা আলোচনা করেন।
এদিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের জন্য একটি আলাদা কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। দোতলায় চেয়ারপারসনের কক্ষের পাশেই এই চেম্বার তৈরি করা হয়েছে।
গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য সুপ্রিম কোর্টের জামিনে তিনি সপরিবার লন্ডনে যান। পরবর্তী সময়ে সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি দেশে ফিরতে পারেননি। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান।
দেশে ফেরার পর রাজধানীর পূর্বাচলে বিএনপির পক্ষ থেকে আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন তারেক রহমান। এরপর তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পাশাপাশি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ ছাড়া তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেন। দেশে ফেরার পর প্রয়োজনীয় নাগরিক আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে তারেক রহমান জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত কাজও সম্পন্ন করেছেন।
ঢাকা-১৭ আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ : ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন তারেক রহমান। গতকাল রবিবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটে তারেক রহমানের পক্ষে বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শফর উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তারেক রহমান বগুড়া-৬ আসন থেকেও এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বলে শনিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান।
যেকোনো এলাকা থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন তারেক রহমান : রিজভী
এদিকে গতকাল সকালে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রিজভী বলেন, ‘তারেক রহমান চাইলে দেশের যেকোনো এলাকা থেকেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে কোথাও তার প্রার্থিতা নিয়ে কোনো বাধা থাকবে না।’
রিজভী বলেন, ‘তারেক রহমান সারা দেশে নির্বাচন পরিচালনা ও ভোটারদের উদ্দীপনার প্রধান প্রতীক। সারা দেশের মানুষ তার নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাকে জাতীয় নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছে। জাতীয় নেতারা যেকোনো জায়গা থেকে নির্বাচন করতে পারেন।’
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে রিজভী অভিযোগ করেন, ‘বাংলাদেশে এখনো আধিপত্যবাদের ছায়া বিস্তৃত রয়েছে। একটি মহল দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এতটাই শক্তিশালী যে, অতীতের মতো ভবিষ্যতেও এসব অপচেষ্টা ব্যর্থ হবে।’
অনুষ্ঠানে জাসাসের আহ্বায়ক চিত্রনায়ক হেলাল খান, সদস্য সচিব জাকির হোসেন রোকনসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। পরে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করা হয়।
ভোটার তালিকায় উঠল তারেক রহমানের নাম : ভোটার তালিকায় নাম উঠেছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। তিনি ঢাকা-১৭ আসনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ভোটার হয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীও হচ্ছেন তিনি। গতকাল রবিবার ইসির জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক বলেছেন, তারেক রহমান ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে।
এর আগে গত শনিবার দুপুর ১টায় আগারগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনে গিয়ে আঙুলের ছাপ, আইরিশের প্রতিচ্ছবি আর বায়োমেট্রিক তথ্য দেন তারেক রহমান।
এরপর ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছিলেন, ভোটার তালিকায় নাম তুলতে বিএনপি নেতা শনিবার আনুষ্ঠানিকতা সারলেও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে সময় লাগবে এক দিন।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা ইতিমধ্যে চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন, তবে ভোটার তালিকা আইনে বলা আছে, ইসি যেকোনো সময় ভোটার হওয়ার যোগ্য যেকোনো ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
২০০৭-০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়। তারেক রহমান তখন ছিলেন কারাগারে। ২০০৮ সালে কারামুক্তির পর তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। এরপর আর দেশে না ফেরায় এনআইডিও পাননি।
তবে চব্বিশের অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রায় দেড় বছর পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম তুলেছেন। তারেক রহমান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬ নির্বাচনী আসনে ‘ধানের শীষ’-এর প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট আসন দুটির দলীয় সমন্বয়কদের সঙ্গে নিয়ে এই স্বাক্ষর করেন তারেক রহমান।