বিদায়ী বছর সোনার ভরিতে ৮৬ হাজার টাকা বেড়েছে

বিদায়ী বছর দেশে দেশে বিনিয়োগের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল সোনা। ফলে বিশ^বাজারে সোনার দামে তৈরি হওয়া অস্থিরতার আঁচ বছর জুড়েই দেখা গেছে স্থানীয় বাজারেও। দাম বৃদ্ধিতে তৈরি হয়েছে একের পর এক রেকর্ড। এ ধারাবাহিকতায় দেশের বাজারে বিদায়ী বছরে প্রতিভরি সোনার দাম বেড়েছে ৮৫ হাজার ৮৯৫ টাকা। যা ২০২৪ সালের দামের চেয়ে ৬০ শতাংশেরও বেশি। 

জানা গেছে, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সোনার দাম নির্ধারণ করে। ব্যবসায়ীদের এই সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বছর জুড়ে সোনার দাম ব্যাপক ওঠানামা করেছে। বিদায়ী বছরে অন্তত ৯১ বার নির্ধারণ করতে হয়েছে সোনার দাম। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৬৩ বার এবং কমেছে ২৮ বার। এতে এক বছরের মধ্যে এক ভরি সোনার দাম ৮৫ হাজার ৮৯৫ টাকা।

বাজুস সর্বশেষ গতকাল বৈঠক করে সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করে, যে দাম আজ থেকেই কার্যকর হবে। বাজুসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতিভরি সোনায় সবশেষ ২ হাজার ৭৪১ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতিভরি সোনার দাম ২ হাজার ৫৬৬ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনায় ২ হাজার ২৭৫ টাকা কমিয়ে নতুন দাম ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরি সোনায় ১ হাজার ৮৬৬ টাকা কমিয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৫৭ টাকা।

তবে বিদায়ী বছরটিতে ভালো মানের এক ভরি সোনার সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকায়। এর পরপরই বাজুস দুই বার সোনার দাম কমানোর ঘোষণা দেয়।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, বিশ^বাজারেও সোনার দামে রেকর্ড হয়েছে পুরনো বছরে। ডিসেম্বরের শেষভাগে এসে এই দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যদিও কিটকোর তথ্য বলছে, বছরের শেষ দিনে এই দাম কিছুটা কমে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৩০৭ ডলারে নামে।

সোনার আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে জড়িত সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস বলছে, পুরনো বছরের সোনার দাম বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতা নতুন বছরেও অব্যাহত থাকবে। যার একটি পূর্বাভাস দিয়েছে গোল্ডম্যান স্যাকস। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত গোল্ডম্যান স্যাকসের ২০২৬ সালের এক পূর্বাভাসে বলা হয়, ‘আগামী বছর পুরো কমোডিটি খাতের মধ্যে সোনা হবে সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ। যদি বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মতো বৈচিত্র্যকরণে যোগ দেয়, তাহলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৯শ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-চীন এআই ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা সোনায় বিনিয়োগের কারণগুলোর মধ্যে বড় একটি। কারণ ২০২৫ সালে কমোডিটি সূচকগুলোর মধ্যে শক্তিশালী রিটার্ন এসেছে মূল্যবান ধাতু থেকে, যা সুদহার বা বন্ডের লাভকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী বছরে যদি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার আরও কমায় তাহলে সোনায় বিনিয়োগ এমনিতেই বেড়ে যাবে।

এদিকে গোল্ডম্যান স্যাকস সবচেয়ে বেশি আশাবাদী সোনার বিষয়ে এবং এর পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চাহিদার বড় ভূমিকার কথা বলা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা একটি শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। প্রতিমাসে গড়ে ৭০ টন করে সোনা কিনবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। যেখানে বিদায়ী বছরে গড়ে ৬৬ টন করে সোনা কেনা হয়েছে, যা ২০২২ সালের মাসিক গড় ১৭ টনের চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেশি।

এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘প্রথমত ২০২২ সালে রাশিয়ার রিজার্ভ জব্দ করা উদীয়মান বাজারগুলোর রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। দ্বিতীয়ত, চীনের মতো উদীয়মান দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা রিজার্ভের অংশ এখনো বৈশ্বিক সহকর্মীদের তুলনায় কম, বিশেষ করে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চীনের উচ্চাকাক্সক্ষার প্রেক্ষাপটে। অর্থাৎ চীন আরও বেশি সোনা কিনতে আগ্রহী। তৃতীয়ত, জরিপগুলো দেখাচ্ছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনার প্রতি আগ্রহ এখন রেকর্ড উচ্চতায়।’

বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন, সোনার দামের পূর্বাভাসে ঊর্ধ্বমুখী ঝুঁকি রয়েছে, যদি এই বৈচিত্র্যকরণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়িয়ে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আরও বিস্তৃত হয়। এই প্রবণতা ইতিমধ্যেই বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে  সোনার জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে এবং বহু বছরের শেয়ারবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সোনার দাম খানিকটা কমে আসতে পারে। ৪ হাজার ২০০ ডলারে নামতে পারে প্রতি আউন্স সোনার দাম। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা আবার ৪ হাজার ৪০০ ডলারের ওপরে উঠে যাবে। তৃতীয় প্রান্তিকে সোনা সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতার নতুন রেকর্ড ৪ হাজার ৬৩০ ডলার ছাড়াতে পারে এবং চতুর্থ বা শেষ প্রান্তিকে তা ৪ হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।