বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার আগমন ছিল আকস্মিক। তবে তার আসা ছিল অনিবার্য। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে দলের সদস্যপদ নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে পথচলা শুরু করেন। দলের প্রতিষ্ঠাতার স্ত্রী হলেও তিনি দলের নিয়ম অনুযায়ীই নেতৃত্বে উঠে আসেন। তিনি ছিলেন আপসহীন। দেশের বাইরেও বেগম জিয়া সমান শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। তিনি সবসময় একাধিক আসনে নির্বাচিত হয়েছেন। তার মতো জনপ্রিয়তা বিশ্বের কোনো নেতার নেই।’ গতকাল বুধবার বেলা ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজার আগে সঞ্চালকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং দেশের স্বার্থে অনমনীয়তার কারণে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে তাকে ব্যক্তিগত শত্রু হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। তিনি বলেন, স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা, স্বৈরাচারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং তথাকথিত ১/১১ সরকারের সময়ও দেশনেত্রীকে কারাবন্দি করা হয়। ফ্যাসিবাদী হাসিনা স্রেফ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য দেশনেত্রীকে তার শহীদ স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উৎখাত করেন এবং মিথ্যা অভিযোগে ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। তবু আধিপত্যবাদী অপরাজনীতির সঙ্গে তিনি আপস করেননি; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা ভোটাধিকারের প্রশ্নেও আপস করেননি। ফলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ফ্যাসিস্ট শাসনবিরোধী লড়াইয়ের অনন্ত অনুপ্রেরণা।
তিনি বলেন, ‘আজ দেশনেত্রী সব অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে লক্ষ-কোটি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে জানাজায় আমাদের সামনে উপস্থিত। অন্যদিকে যারা তাকে জেলে পাঠিয়েছে, যারা তাকে গৃহহীন করেছে, তারা রান্না করা খাবার খেতে পারেনি, পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। মাথার ওপর তাদের ঝুলছে মৃত্যুর পরোয়ানা। এরশাদকে ভোগ করতে হয়েছে দীর্ঘ কারাবাস, ১/১১ সরকারের প্রধান ব্যক্তিরাও দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে।’
দল ও দলীয় নেতাদের মনোবল অটুট রাখার লক্ষ্যে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন বলে উল্লেখ করেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের ক্লান্তিহীন পথচলা। ক্রমে দলের প্রতিষ্ঠাতার স্ত্রী হয়েও দলের গঠনতন্ত্র সমুন্নত রেখে তিনি ভাইস চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন এবং পরে দলীয় কাউন্সিলে নির্বাচিত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছরই তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করেছেন।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ৯ বছর স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে ১৯৯১ সালে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপিকে পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন তিনি। জাতির কাছে তিনি পান ‘আপসহীন দেশনেত্রী’র মর্যাদা। দেশ ও মানুষের স্বার্থরক্ষায় চির আপসহীন এ দেশনেত্রী দেশ-বিদেশের কোনো অপশক্তির সামনে কখনো মাথানত করেননি। কোনো প্রলোভন, ষড়যন্ত্র বা হুমকি তাকে জীবনের শেষ অবধি আপসের পথে বাধ্য করতে পারেনি। তিনি সবসময় দেশের মানুষের পাশে ছিলেন।
খালেদা জিয়া বলতেন, ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই’ এ কথা উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, জনগণের কল্যাণে তিনি একের পর এক যুগান্তকারী কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে তার সাফল্যের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বে ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল।
জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে একজন ব্যক্তি যতগুলো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, তিনি তা করেছেন। নির্বাচনে পাঁচটি করে আসনে এবং শুধু ২০০৮ সালে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই বিজয়ী হয়েছেন। জনগণের প্রকৃত সমর্থনে এবং বিপুল ব্যবধানে নির্বাচনে পরাজয়ের গ্লানি তাকে স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়েছে বারবার। জনপ্রিয়তার এমন দৃষ্টান্ত শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বে বিরল। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, গণতন্ত্রকে ভালোবেসে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন। দায়িত্ব পেয়ে গণতন্ত্রকে কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছেন বলেই দেশ-বিদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ তাকে ‘গণতন্ত্রের মাতা’ বলে সম্মানিত করেছেন। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে তার গৃহীত কর্মসূচি ছিল অসংখ্য। নারীশিক্ষার প্রসারে উপবৃত্তি প্রথা ও ‘শিক্ষার জন্য খাদ্য’ কর্মসূচি এবং মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবাসীদের কল্যাণের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা ছিল তার অন্যতম কাজ।
তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া তার দুই শিশুপুত্রসহ ১৯৭১ সালের ২ জুলাই থেকে বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি অবস্থায় কাটিয়েছেন। স্বামী স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ফোর্সেস কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় খালেদা জিয়া দুই শিশুপুত্রসহ পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি হয়েছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে এ পরিবারের অবদান এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সাবেক এ কূটনীতিক বলেন, দলমত নির্বিশেষে পুরো দেশবাসীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়া নিয়ে খালেদা জিয়া বিদায় নিচ্ছেন। পেছনে রেখে গেছেন এক মহীয়সী নারী, এক সংগ্রামী রাজনীতিবিদ, এক দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের অনন্য কর্মজীবনের উদাহরণ; যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়া বলতেন, “দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। বাংলাদেশই হলো আমার ঠিকানা। এই দেশ, এই দেশের মাটি ও মানুষ আমার সবকিছু।” এই দেশের মাটিতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আজ এই দেশের মাটিতেই তার শহীদ স্বামীর পাশে তিনি চিরদিনের জন্য শায়িত হবেন। ইনশাআল্লাহ, আমরা তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যাব। দেশনেত্রীর মতোই গণতন্ত্র, শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে জনগণের কল্যাণে লক্ষ্য স্থির রেখে। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।’
খালেদা জিয়ার জানাজার আগে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারপারসনের মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না।’ তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই বছরের বেশি সময় অন্ধকার কারাগারে আবদ্ধ থাকার সময় উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে দেশনেত্রী দারুণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পুরো দেশবাসী সাক্ষী, পায়ে হেঁটে তিনি কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু নির্জন কারাগার থেকে বের হন চরম অসুস্থতা নিয়ে। দেশ-বিদেশের চিকিৎসকদের মতে, পরবর্তী সময়ে গৃহবন্দি অবস্থায় চার বছর বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ না দেওয়ার কারণেই তার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো এই অপরাজেয় নেত্রীর। তাই এই মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না।’