পাঁচ ব্যাংক মিলে একীভূত হওয়া ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের’ গ্রহকরা স্বাভাবিক লেনদেন শুরু করেছেন। ব্যাংকের শাখাগুলোয় টাকা উত্তোলন ও জমা দিয়েছেন গ্রাহকরা। পুরনো ব্যাংকের চেক ব্যবহার করেই এসব লেনদেন করা গেলেও অনেক গ্রাহক নির্ধারিত পরিমাণ টাকা উত্তোলন করতে পারেননি বলে জানা গেছে। তবে পরিমাণে কম হলেও গ্রাহকদের ব্যাংক থেকে টাকা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ঢাকার কয়েকটি শাখা ঘুরে দেখা গেছে, নতুন বছরের প্রথমদিনেই পাল্টে ফেলা হয়েছে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের নামফলক। বেশিরভাগ শাখায় লাগানো হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর সাইনবোর্ড। আবার কোথাও এটা ঝোলানোর প্রক্রিয়া চলছে।
জানা গেছে, ব্যাংকে স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হলেও উপস্থিত সব গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে পারেনি ব্যাংকগুলো। চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করার ঘোষণা দেওয়া হলেও ব্যাংক কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট করে দেওয়া পরিমাণই উত্তোলন করতে পেরেছেন গ্রাহকরা।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, এখন স্বাভাবিকভাবে টাকা জমা ও উত্তোলন করা যাচ্ছে। আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় ২ লাখ টাকা পর্যন্ত একবারে উত্তোলনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তারা জানান, এখন আগের ব্যাংকের পাশাপাশি নতুন ব্যাংকের সাইনবোর্ড থাকবে। ধীরে ধীরে পুরনো সাইনবোর্ড সরিয়ে নেওয়া হবে। তখন শুধু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামেই পরিচিতি পাবে এই পাঁচ ব্যাংক। এদিকে অল্প হলেও দীর্ঘদিন পর টাকা তুলতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেন আমানতকারীরা। তবে চাহিদামতো টাকা উত্তোলনের সংকট এখনো দূর হয়নি বলে জানান তারা।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পল্টন শাখায় টাকা তুলতে আসা গ্রাহক রহমান বলেন, ‘অনেক অপেক্ষার পর টাকা তুলতে পেরে ভালো লাগছে।’
এদিকে একই ব্যাংকের চট্টগ্রাম সদরঘাট শাখার গ্রাহক সানি চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বস্তিবাসী সন্তানদের জন্য পরিচালিত একটি স্কুলের প্রায় তিন লাখ এই শাখায় জমা আছে। দীর্ঘদিন টাকা তুলতে পারেনি। আজ (বৃহস্পতিবার) যোগাযোগ করেছি। ব্যাংকে থেকে কয়েকজন গ্রাহককে টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে টাকা না থাকায় অন্য গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী রবিবার ব্লাঙ্ক (খালি) চেক নিয়ে যেতে বলেছে। কত টাকা উত্তোলন করা যাবে শাখার কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট করে দেবেন।’
চট্টগ্রামে এক্সিম ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার বিনিয়োগ বিভাগের দায়িত্বরত ইনচার্জ মাসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বছরের প্রথম দিনে সাইনবোর্ড পরিবর্তন করা হয়েছে। আগের সাইনবোর্ডের ওপর নতুন ব্যাংকের ব্যানার লাগানো হয়েছে।’
গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশ করা স্কিম বা কর্মসূচি অনুযায়ী ব্যবস্থাপক নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই অনুয়ায়ী গ্রাহকরা পুরনো কাগজপত্র দিয়ে অল্প টাকা তুলতে পারছেন। আগামী সপ্তাহ থেকে লেনদেন আরও স্বাভাবিক হবে।’
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমস্যাগ্রস্ত ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে গঠিত করা হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এই পাঁচ ব্যাংকের দায়, সম্পদ ও জনবল অধিগ্রহণ করছে নতুন ব্যাংক।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক গত মঙ্গলবার প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন ব্যাংক গঠনের বিস্তারিত স্কিম বা কর্মসূচি প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত করা স্কিম অনুযায়ী, ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত যেকোনো সময় গ্রাহক একসঙ্গে তুলতে পারবেন। ২ লাখ টাকার বেশি আমানত প্রতি তিন মাস অন্তর সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা করে দুই বছর পর্যন্ত উত্তোলন করা যাবে। বিশেষ সুবিধা রয়েছে বয়স্ক গ্রাহকের জন্য। ৬০ বছরের বেশি বয়সী গ্রাহক ও ক্যানসার, কিডনি ডায়ালাইসিসসহ গুরুতর রোগে আক্রান্তরা চিকিৎসার প্রয়োজনে সময়সীমার বাইরে গিয়েও টাকা তুলতে পারবেন।
পুরনো কাগজপত্র দিয়েই লেনদেন করা যাচ্ছে। একীভূত প্রক্রিয়ার আওতায় আগের ব্যাংকের নামে থাকা চেকবই, ডিপোজিট সিøপ, ভাউচারসহ সব ব্যাংকিং কাগজপত্র বৈধ থাকবে। নতুন করে কোনো কাগজপত্র পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। তবে নির্ধারিত সময়ের আগে স্থায়ী আমানত ভাঙা যাবে না। বিদ্যমান আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা পাবেন গ্রাহক। নতুন আমানতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এদিকে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ বা মামলা নেই, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মী হিসেবে যুক্ত হবেন। প্রয়োজনে পরিচালনা পর্ষদ চাকরির শর্ত পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী, পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত নতুন ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। আর পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন হিসেবে সরকার ইতিমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে, যা রেজল্যুশন স্কিমে ‘ক’ শ্রেণির শেয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে।