সমাধিস্থলে মানুষের ঢল, মসজিদে দোয়া

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই শেরেবাংলা নগরে তারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এদিকে তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মসজিদে বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বাদ আসর গুলশানে আজাদ মসজিদে দোয়া মাহফিলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা অংশ নেন। অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও তার আত্মার শান্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।

সকাল থেকেই বিএনপির নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শেরেবাংলা নগরে খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানান। পরে নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে। তারা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে আসেন। এদেরই একজন শরিফুল ইসলাম। তিনি খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে এসেছেন রাজধানী ঢাকার মিরপুর থেকে। পেশায় ব্যবসায়ী শরিফুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি না। তবে খালেদা জিয়াকে পছন্দ করি, তার রাজনীতি পছন্দ করি। আজ শুক্রবার সুযোগ পেয়ে ছুটে এসেছি তার জন্য দোয়া করতে। ৫ আগস্টের পর খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির অভিভাবক ছিলেন না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের সর্বস্তরের জনগণের অভিভাবক। দলমত নির্বিশেষে তিনি ছিলেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন রাজনীতিবিদ। তার মৃত্যুর পর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে যে জানাজা হয়েছে তা স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জানাজা। সবার ভালোবাসা নিয়ে তিনি বিদায় নিয়েছেন।’ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থেকে এসেছেন মাহতাব নামে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক তৃণমূল নেতা। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জনগণের দলে পরিণত হয়েছিল।’ 

দাদা-দাদির কবর জিয়ারত করলেন জাইমা রহমান : গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। এ সময় জাইমা রহমান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান, খালেদা জিয়ার মেজ বোন সেলিনা ইসলাম, তার স্বামী আমিনুল ইসলাম। তিনি হুইল চেয়ারে সমাধিস্থলে আসেন। খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের পরিবারের সদস্যরাও আসেন। আসেন খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমও। শোকগ্রস্ত মনে কবরের সামনে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারা। নাতনি জাইমা রহমান দাদুর কবরের সামনে ফুলের তোড়া রেখে এবং নীরবে দাঁড়িয়ে সুরা পড়েন। এ সময় কবর প্রাঙ্গণে কোরআন তেলাওয়াত করেন জাতীয়তাবাদী উলামা দলের সদস্যরা। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা কবরে জিয়ারতে আসায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কড়াকড়ি করা হয়। নেতাকর্মীদের কাউকে ওই সময়ে কবর প্রাঙ্গণে যেতে দেওয়া হয়নি।

খালেদা জিয়াকে স্লো পয়জনিং করে হত্যা করা হয়েছে দাবি আমান উল্লাহ আমানের : গতকাল দুপুরে খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন নব্বইয়ের ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারা। নব্বইয়ের ডাকসুর ভিপি ও সেই সময়ে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমানের নেতৃত্বে নেতারা খালেদা জিয়ার কবরের পাশে ফাতেহা পাঠ করে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতাদের মধ্যে হাবিবুর রহমান হাবিব, জহির উদ্দিন স্বপন, খায়রুল কবির খোকন, নাজিম উদ্দিন আলম, খন্দকার লুৎফর রহমান, নাজমুল হক প্রধান, মীর সরাফত আলী সপুসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আমান উল্লাহ আমান দাবি করে বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে সেøা পয়জনিংয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাকে যথাযথ চিকিৎসা না দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলার মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এড়াতে পারেন না।’

আমানউল্লাহ আমান বলেন, ‘খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের জনগণের অভিভাবকের মতো একজন নেতা। সেই অবস্থান মেনে নিতে না পেরেই প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হতে হয়েছে তাকে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই এবং এর জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’ এ সময় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন উপস্থিত ছিলেন। পরে খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম দলের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৬ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন।

এ ছাড়া, খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত শেষে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেছেন বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু।

কবর জিয়ারত করলেন বিজিএমইএ নেতারা : সকালে খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতারা। পরে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে মরহুমার স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন তারা। এ সময় বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান ও মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী, ফয়সাল সামাদ, নাফিস-উদ-দৌলা, মজুমদার আরিফুর রহমান, কাজী মিজানুর রহমান, রশিদ আহমেদ হোসাইনী ও সাকিফ আহমেদ সালাম।

জিয়ারত শেষে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী। দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রসারে তার অবদান অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রীয় শোকের এই সময়ে আমরা তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।’

গুলশান আজাদ মসজিদে দোয়া : বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ও দলের সিনিয়র নেতারা অংশ নেন।

এদিকে দোয়া মাহফিলে অংশ নিতে দুপুর থেকেই গুলশান আজাদ মসজিদ ও এর আশপাশের এলাকায় বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার  নেতাকর্মী জড়ো হন। এছাড়া দলমত নির্বিশেষে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষও মরহুমার রুহের মাগফেরাত কামনায় এ দোয়ায় শরিক হন।

বায়তুল মোকাররমে দোয়া : খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় গতকাল বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুমার নামাজ শেষে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়। মুসল্লি ও সাধারণ মানুষজন এই দোয়ায় অংশ নেন। দোয়ার আগে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়। এরপর দোয়ায় খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়। আল্লাহপাক যেন তাকে জান্নাতের বাসিন্দা করেন এ কামনাও করা হয়।

এদিকে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গতকাল দেশ জুড়ে তৃতীয় ও শেষ দিনের মতো রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ৩১ ডিসেম্বর বুধবার থেকে ২ জানুয়ারি শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। শোকের শেষ দিন গতকালও দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি-বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।

গত ৩১ ডিসেম্বর বুধবার পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে তার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে শায়িত করা হয়। ছেলে তারেক রহমান স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে মাকে কবরে দাফন করেন। দাফনের আগে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে মরহুমার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। এছাড়া খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি সাতদিনের শোক পালন করছে। কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

খালেদা জিয়ার জন্য ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রার্থনা : গতকাল বিকেলে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের উদ্যোগে খালেদা জিয়ার আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। এ সময় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ অভিযোগ করে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ অবহেলা ও নির্যাতনের মাধ্যমেই তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার দায় শেখ হাসিনার।’

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অপর্না রায় সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রার্থনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, দেবাশীষ রায় মধু, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, বিএনপি নেতা জাকির হোসেন, যুবদলের মেহেবুব মাসুম শান্ত প্রমুখ।