ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটি যেন প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা এক নিরাপদ আশ্রয়। ক্যাম্পাসে সবুজে ভরা, যেখানে গাছেরা কথা বলে, পাখিরা গান গায় আর নীরবতা হয়ে ওঠে শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পথগুলো যেন কবিতার পঙ্ক্তি। নিঝুম দুপুরে যেমন শান্ত নদী এঁকে বেঁকে বয়ে চলে, তেমন ক্যাম্পাসে সবুজের স্রোত বয়ে চলেছে আপন মনে। শিক্ষার্থীদের তারা শেখায় কীভাবে শান্ত থাকতে হয়। মাথার ওপরে নীল আকাশ আর সেই আকাশের দিকে সবুজ গাছপালার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে মনে হয় যেন কোনো এক কবির কল্পনার রাজ্যে এসে পড়েছি এটি যেন কোনো এক চিত্রশিল্পীর রংতুলিতে আঁকা জীবন্ত ক্যানভাস।
১৭৫ একরের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে উঠেছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এখানে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছ। তার মধ্যে ফলদ গাছগুলো হলো আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, তাল, আমলকী, পেয়ারা। এ ছাড়াও রয়েছে গোলাপ, গাঁদা, বাগানবিলাস, কৃষ্ণচূড়া ও শিউলি ফুলের গাছ, যা ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
প্রধান ফটক থেকে সামনে তাকালেই চোখে পড়ে ডায়না চত্বর। এখানে রয়েছে সারি সারি সোনালু ও ঝাউগাছ। গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়। সোনালু ফুলের মৌসুমে থরে থরে হলুদ সোনালু ঝুলে থাকে। দেখে মনে হয় যেন কোনো এক ফুলের রাজ্য, যেখানে প্রকৃতি তার সব সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে। গাছগুলো যেমন ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যবর্ধন করছে, তেমনি ছায়া দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অন্যদিকে পাখপাখালির আবাসস্থল হিসেবেও কাজ করছে। মাঝে মাঝে চোখ পড়ে আপন মনে লাফিয়ে বেড়ানো কাঠবিড়ালীর দিকে। বসন্তে পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে এই ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা বসন্ত উৎসব আয়োজন করে এই স্থানে। নিবিড় ছায়ার মধ্যেও গাছের পাতার ফাঁকে আসা রোদ যেন অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। রঙবেরঙের ফুল, সঙ্গে গাছের সবুজ পাতা এমন সৌন্দর্য সৃষ্টি করে, যা বর্ণনাতীত।
এরপর চোখ জুড়িয়ে যায় প্যারাডাইস রোডে গেলে। এক অদ্ভুত শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশ বিরাজ করে এই রাস্তায়। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ কোনো কবির কল্পনার অসম্ভব সুন্দর দৃশ্যের মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সবাই এই রাস্তা ধরে হেঁটে বেড়ায়। কেউবা ছবি তোলে, ভিডিও করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ প্রান্তে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও মফিজ লেকের পাশাপাশি অবস্থান এক অনন্য সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। এখানে সবসময় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে। লেকের পানিতে শেষ বেলার সূর্যের আলো পড়লে যেমন ঝলমল করে ওঠে, ঠিক তেমন রাতে চাঁদের আলোতেও ঝলমল করে। সঙ্গে মৃদু-মন্দ বাতাসে পানিতে ঢেউ খেলে যায়। এটি এক অপরূপ দৃশ্য। লেকের রাস্তার পাশে থাকা ঝাউ গাছগুলোর বাতাসে দোল খায়, তাদের শোঁ শোঁ শব্দ শুনলে মনে হয় কোনো সি-বিচের ধারের ঝাউবনে এসে পড়েছি। লেকে রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। এখান থেকে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। কখনো দেখা যায় কলাপাতা বাতাসে দোল খাচ্ছে, আবার কখনো দেখা যায় দলবেঁধে পাখি উড়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে এই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য দেখে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’।
বিভিন্ন ঋতুতে ক্যাম্পাস ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। কখনো গ্রীষ্মের তপ্ত রোদে পুড়ে শুষ্ক রূপ নেয়, পরক্ষণেই আবার বৃষ্টির শীতল পরশ প্রাণ ফিরিয়ে দেয় প্রকৃতির মাঝে। আবার কখনো হাড়কাঁপানো শীতে জনজীবন করে তোলে বিপর্যস্ত, আবার কখনো বসন্তের বাতাসে শিক্ষার্থীদের মন করে তোলে উতলা প্রেমিকের ন্যায়। বর্তমানে শিশিরে ভেজা ঘাস আর কুয়াশায় জড়ানো সকাল দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। কুয়াশার নরম চাদরের ভেতর দিয়ে ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল জানিয়ে দিচ্ছে আসছে শীত, আসছে একই সঙ্গে স্নিগ্ধতা ও রুক্ষতার মৌসুম। শীতের এমন আগমনী ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির রূপ; বইতে শুরু করেছে উত্তরের হিমেল হাওয়া। সবশেষে বলা যায়, ইবির সৌন্দর্যের প্রেমে পড়তে আপনি বাধ্য!
লেখক : শিক্ষার্থী, পঞ্চম সেমিস্টার, তৃতীয় বর্ষ কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া