নিরাশ বিনিয়োগকারীদের আকাক্সক্ষার বছর

দেশের আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাজার সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা ছিল পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ায় সামনে আসে তালিকাভুক্ত কোম্পানির দেউলিয়ার চিত্র। ইতিমধ্যে একীভূত হয়েছে পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক এবং বন্ধ হয়েছে নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বন্ধের তালিকায় রয়েছে বেশকিছু বীমা কোম্পানিও। ফলে গত বছর প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপেও গতি ফেরেনি শেয়ারবাজারে।

এদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুঁজিবাজার উন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষেপ থাকলেও বছর জুড়ে আইপিও শূন্য ছিল শেয়ারবাজার। বছর শেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও এর কোনো প্রভাব শেয়ারবাজারে নেই। এমনকি নির্বাচনের পর বাজার পরিস্থিতি কেমন হবে তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন বিনিয়োগকারীরা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নির্বাচিত সরকার বিএসইসির সংস্কার উদ্যোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে মৌলভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে সময় উপযোগী পদক্ষেপ নেবে। যার মাধ্যমে শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি সংকট দূর হবে।

সরকার পরিবর্তন ও সংস্কারের সুফল না থাকার প্রসঙ্গে একজন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকের মতে, ভালো কোম্পানিই পুঁজিবাজারের প্রাণ। গত এক দশকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অর্ধেকের বেশি ছিল দুর্বল মনের। সরকার পরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময়ে মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা হতাশ। অবশ্য ত্রুটিপূর্ণ আইপিও বিধিমালা ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া, অনিয়মের মাধ্যমে নিম্নমানের কোম্পানির আইপিও অনুমোদন, সহজ ব্যাংকঋণ প্রাপ্তি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া এবং বর্তমান কমিশনের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতাকে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তিনি।

জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার আমলে পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হলেও  চলতি বছরের ১৫ ডিসেম্বর দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে (এটিবি) রেনাটা পিএলসির প্রেফারেন্স বা অগ্রাধিকারমূলক শেয়ারের লেনদেন শুরু হয়েছে। এর আগে গত ২০ আগস্ট একই প্ল্যাটফর্মে রানার অটো সাসটেইনেবিলিটি বন্ডের লেনদেন শুরু হয়।

এ ছাড়া বছর জুড়ে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন, শৃঙ্খলা ফেরানো, অসদাচরণ রোধ, সার্ভেইল্যান্সের আধুনিকায়ন, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণসহ আইনকানুন সংশোধন এবং আধুনিকায়নের কাজ করেছে। একইসঙ্গে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক মানের সুশাসন নিশ্চিত করতে পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্স বিএসইসির কাছে বেশ কিছু সুপারিশ জমা দিয়েছে। আর সেইসব সুপারিশ সংশ্লিষ্ট অংশিজনের মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করছে বিএসইসি।

বিএসইসির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর মধ্যে আইন ও বিধি-বিধান সংস্কার; আইপিও প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন; নেগেটিভ ইক্যুইটির সমস্যা সমাধান; লভ্যাংশ পরিশোধে স্বচ্ছতা; বিও অ্যাকাউন্ট রক্ষণাবেক্ষণ ফি কমানো; ব্রোকারদের টার্নওভার ট্যাক্স কমানো; সার্ভিল্যান্স সিস্টেম আপগ্রেড; ব্রোকারেজ হাউজের নিবন্ধন বাতিল; কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর উদ্যোগ; বিএসইসি নিয়ম ভঙ্গ, আইপিও তহবিলের অপব্যবহার, ইনসাইডার ট্রেডিং ও মিউচুয়াল ফান্ডের অনিয়ম নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে কমিশন।

এ ছাড়া অনিয়ম ও কারসাজির সঙ্গে জড়িত কতিপয় ব্যক্তিকে পুঁজিবাজারে আজীবন নিষিদ্ধ করে বর্তমান কমিশন। যার মধ্যে এলআর গ্লোবালের সিইও রিয়াজ ইসলাম এবং বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সালমান ফজলুর রহমান এবং ভাইস-চেয়ারম্যান আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান। এ ছাড়া আইএফআইসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের সিইও ইমরান আহমেদকে ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

এসবের মধ্যে ২০২৫ সালে পুঁজিবাজারে ধরাবাহিকভাবে সূচক, লেনদেন, মূলধন কমেছে। বন্ধ বা একীভূত হওয়া প্রতিষ্ঠানের শেয়ার শূণ্য হওয়ায় রাতারাতি পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অসংখ্য সাধারণ বিনিয়োগকারী। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

বিনিয়োগকারীরা দাবি করেছেন দেশের শেয়ারবাজার পরিস্থিতি ভয়াবহ ও দুর্বিষহ। বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের নেতাবক্তব্যে সাজ্জাদুল হক বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বর শেয়ারবাজারকে আইসিইউতে ঢুকিয়ে দিয়েছে। যা ওই সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত (২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট) ছিল। যার ধারাবাহিকতা ৫ই আগস্ট পরবর্তী বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও রয়েছে। এই সময়ে বিএসইসি সংস্কারের নামে শেয়ারবাজারের বিনিযোগকারীদের ‘অর্থনৈতিক গণহত্যার শিকারে’ পরিণত করেছে। যার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন বর্তমান ভয়াবহ দূর্বিষহ বাজার পরিস্থিতি।

তিনি বলেন, বিগত ১৭ মাসে বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর শেয়ারবাজারে উৎসাহমূলক কোনো একটা কাজ দেখাতে পারেনি, নিরুৎসাহিতমূলক কর্মকা- প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে করেছে। যার জ¦লন্ত প্রমান হলো আন্তর্জাতিক মার্জার রুলস অনুসরণ না করে ৫টি ব্যাংক মার্জার করে ব্যাংকের আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডার বিনিয়োগকারীদের দূর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিগত ১৭ মাসে একটাও গ্রহণযোগ্য আকর্ষণীয় কোম্পানিকে আইপিওতে আনার সক্ষমতা দেখাতে পারেনি।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজারের এ সংকট দীর্ঘদিনের, যার সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত, কার্যকরী ও যুগোপযোগী সংস্কার। এর বাস্তবায়ন রাতারাতি করা সম্ভব না হলেও সব অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পুঁজিবাজারে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এ জন্য নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে শেয়ারবাজার এমন অনিয়ম না ঘটে।

বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে পুঁজিবাজারে স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা আশায় ছিলাম নির্বাচনকালীন শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। নতুন সরকারের আগমনের বার্তায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রভাব ফেলবে। কিন্তু আপাতত কোনো প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, তালিকাভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত ও বন্ধ হয়ে যাওয়া। ইতিমধ্যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়েছে, নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। অনেকগুলো বীমা কোম্পানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এখন শেয়ারশূন্য হয়ে তারা রাস্তায় বসেছেন। এ অবস্থায় বাজার পরিস্থিতি ভালো আশা করা মুশকিল।

তিনি বলেন, শুধু নির্বাচনকালীন নয়। প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকিং খাতের শেয়ারে মনোযোগ দিয়ে থাকেন, এ বছর সেটিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কারণ বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কে আছেন। দেশের শেয়ারবাজার একটি দুষ্টচক্রে আটকে গেছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আপাতত কাটবে বলে মনে হচ্ছে না। এখন আমরা নির্বাচিত সরকারের দিকে তাকিয়ে আছি। আমরা চাই, নতুন সরকার শেয়ারবাজারের বিষয়ে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো আতঙ্ক বা ভয়ের কারণ হবে না। দুষ্টচক্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করতে পারবে না।