পেঁয়াজের ভালো ফলনের আশা, দাম নিয়ে শঙ্কা

রাজবাড়ীতে শীতকালীন মুড়িকাটা পেঁয়াজের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে পেঁয়াজের ভালো ফলনের সম্ভবনা রয়েছে। যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয় তাহলে এ বছর মুড়িকাটা পেঁয়াজে লাভবান হবেন চাষিরা। তবে ভরা মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি করায় দর পতনের শঙ্কাও রয়েছে তাদের মধ্যে।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে জেলায় মোট ৩৬ হাজার ৯২১ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে। এখন পর্যন্ত জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৯১৮ হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৩ হেক্টর বেশি। জেলার পাঁচ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে গোয়ালন্দ উপজেলায় ২ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে। এরপরই রয়েছে কালুখালী উপজেলা। এই উপজেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১ হাজার ২৩৮ হেক্টর, পাংশা উপজেলায় ৫০০ হেক্টর ও সদর উপজেলায় ৩৫০ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছর পেঁয়াজ রোপণ কিছুটা দেরি হলেও তাতে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। পেঁয়াজ রোপণের পর থেকে আর কোনো বৃষ্টি হয়নি। এ কারণে কোনো জমির পেঁয়াজ নষ্ট হয়নি। পেঁয়াজের বীজের দাম গত বছরের তুলনায় অনেক কম ছিল। কিন্তু নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে কিনতে হয়েছে সব ধরনের সার। এ কারণে খরচ কিছুটা বেড়েছে। তবে সরকার যদি এই ভরা মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি করে তাহলে সব কৃষক লোকসানে পড়বে। তাই এই সময়ে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ চান চাষিরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ। বিভিন্ন সবজি আর পেঁয়াজের খেত সবুজের সমারোহ তৈরি করেছে। অধিকাংশ পেঁয়াজ খেতে চাষিরা পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। খেত থেকে আগাছা তুলে ফেলছেন। কেউ কেউ খেতে সেচ দিচ্ছেন। কিছু জমিতে শ্রমিকরা পেঁয়াজের নিচের মাটি আগলা করে দিচ্ছে। কোনো কোনো খেতের পেঁয়াজ মাটি ফুঁড়ে উপরে উঠে এসেছে। অনেক কৃষক জমিতে বালাইনাশক স্প্রে করছেন। কিছু জমিতে কাকতারুয়া বানিয়ে রাখা হয়েছে।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের খোসবাড়ি গ্রামের কৃষক খালেক শেখ বলেন, ‘গত বছর আট বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ও রসুন আবাদ করেছিলাম। এতে আমার প্রায় দুই লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল। তাই এ বছর আবাদ কমিয়ে চার বিঘা জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করেছি। এখন পর্যন্ত পেঁয়াজ ভালো আছে। যদি আর কোনো দুর্যোগ না হয় তাহলে পেঁয়াজের ভালো ফলন হবে। এখন বাজারে ভালো দাম। যদি দাম খুব বেশি না কমে তাহলে হয়তো গত বছরের লোকসান উঠে আসবে।’

হাটবাড়িয়া গ্রামের কৃষক বাবলু শেখ বলেন, ‘পেঁয়াজের বীজের দাম কিছুটা কম থাকলেও বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে। এক কেজি ডিএপি (ডায়ামোনিয়াম ফসফেট) সার কিনতে হয়েছে ৫০ টাকা, এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) সার কিনতে হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং এক কেজি ইউরিয়া সার কিনতে হচ্ছে ৩০ টাক দিয়ে। এ ছাড়া জমিতে অনেক ধরনের কীটনাশক ও ভিটামিন দিতে হয়। এতে আমাদের খরচ বেড়েছে। যদি এ সময় পেঁয়াজ আমদানি করা হয় তাহলে বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে যাবে। আর দাম কমে গেলে ফলন ভালো হলেও আমাদের লোকসান হবে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘পেঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মধ্যে রাজবাড়ী একটি উল্লেখ্যযোগ্য জেলা। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। এবার মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদে চাষিদের ব্যয় তুলনামূলকভাবে গত বছরের চেয়ে কম হয়েছে। এখন পর্যন্ত ফসলের মাঠ ভালো রয়েছে। স্বল্প পরিসরে কিছু মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত বাজারে পেঁয়াজের দাম ভালো রয়েছে। পাশাপাশি হালি পেঁয়াজ রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে সার রয়েছে। কোনো ডিলার যদি সার নিয়ে কোনো প্রকার কারসাজি বা সিন্ডিকেট করে তাহলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’