শোকের আবহের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। দলটির সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাত দিনের শোক কর্মসূচি শেষ হলেই বিএনপি পূর্ণমাত্রায় নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করবে। দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই মনে করছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও এবারের নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে
থাকবেন তিনি। তার মৃত্যুজনিত শোককে শক্তিতে রূপ দেওয়ার কৌশল নেবে বিএনপি। বিশেষ করে, তার জানাজা ও অন্তিম বিদায়ে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাওয়া শ্রদ্ধাকে নির্বাচনী সমর্থনে রূপান্তরের চেষ্টা থাকবে দলটির।
বিএনপির লক্ষ্য, নির্বাচন পর্যন্ত এই আবেগকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রাখা। সেজন্য প্রতিটি আসনে প্রার্থীদের মাঠে সক্রিয় করা, স্থানীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং জনসভা, উঠান বৈঠক ও ব্যক্তি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখনো গভীর শোকের মধ্যে আছি। নির্বাচনী কাজে মন থেকে উৎসাহ আসে না। তবু যতটুকু সম্ভব, তা করতে হচ্ছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক নেতার মতে, ভোটের মাঠে দলের স্পষ্ট বার্তা থাকবে, খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে না থাকলেও বিএনপির রাজনীতি, আদর্শ ও সংগ্রামে তার নেতৃত্ব জীবিত থাকবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন পরিচালনা ও কৌশল বাস্তবায়নের জন্য দলটি ৪১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি প্রার্থী ব্যবস্থাপনা, বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং প্রচারের সার্বিক দিকনির্দেশনার দায়িত্ব পালন করবে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় ইতিমধ্যে ৯ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং অনেককে মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দলটির চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়েছে। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে গেলেও কবে ও কী প্রক্রিয়ায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পদে অধিষ্ঠিত করা হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিএনপিকে।
দলীয় দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির ভেতরে সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচনী প্রচারে ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, প্রচারপত্র ও ডিজিটাল পোস্টারে কার ছবি ব্যবহার করা হবে। বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘খুব দ্রুতই তারা এ বিষয়ে আলোচনা করতে নির্বাচন কমিশনে যাবেন।’
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ার কথা রয়েছে। তফসিল ঘোষণার আগেই বিএনপির অনেক প্রার্থী ব্যানার, ফেস্টুন ও প্রচারপত্র ছাপিয়েছেন, যেগুলোতে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবি রয়েছে। তার মৃত্যুর কারণে সেই অবস্থানে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।
সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫-এর বিধি ৭(চ) অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী শুধু তার বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি প্রচারে ব্যবহার করতে পারবেন। ফলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত প্রচারসামগ্রী নিয়ে বিএনপির মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, চেয়ারপারসনের পদ শূন্য হলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে হিসেবে তারেক রহমান বর্তমানে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন বলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও শোকের পরিবেশের কারণে বিষয়টি এখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, শোক কর্মসূচি শেষে পূর্ণমাত্রায় নির্বাচনী প্রচারে নামবেন দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান। তিনি শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও দেশব্যাপী সফরে যেতে পারেন। তবে সবকিছু নির্ভর করছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনী পরিবেশের ওপর।
দীর্ঘদিন নানা জটিল রোগে ভুগে গত ৩০ ডিসেম্বর সকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়া মারা যান। তার মৃত্যুতে দেশ জুড়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের পাশাপাশি বিএনপি সাত দিনের দলীয় শোক কর্মসূচি পালন করছে, যা শেষ হবে ৫ জানুয়ারি।