সামাজিক উন্নয়ন ব্যাহতের আশঙ্কা এনজিওর

ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ কার্যকর হলে এ খাতে কয়েক দশকের অর্জন, দেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা গুরুতরভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছে বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও। অধ্যাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকে রূপান্তরের যে ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে খাতসংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে সরকারকে পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে গতকাল রবিবার ১৭টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নেতারা যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন, ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, আশার প্রেসিডেন্ট মো. আরিফুল হক চৌধুরী, ব্যুরো বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, টিএমএসএস নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগম, সোসাইটি ফর সোশ্যাল সার্ভিসেস-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সন্তোষ পাল, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এনডিপি) নির্বাহী পরিচালক মো. আলাউদ্দিন খান, সাজেদা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাহিদা ফিজ্জা কবির, অন্তর সোসাইটি ফর ডেভেলপমেন্টের প্রিন্সিপাল অ্যাডভাইজার মো. এমরানুল হক চৌধুরী, পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মো. সালেহ বিন সামস, বাসা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আ ক ম সিরাজুল ইসলাম, ঘাসফুলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আফতাবুর রহমান জাফরী, কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করীম চৌধুরী, পিবিকের নির্বাহী পরিচালক খালেদা শামস, সিদিপের নির্বাহী পরিচালক মিফতা নাইম হুদা, আরডিআরএসের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরুল কায়েস মুনিরুজ্জামান, কোডেকের নির্বাহী পরিচালক ড. খুর্শিদ আলম এবং এফডিএ ফরিদপুরের নির্বাহী পরিচালক মো. আবু ছাহের আলম।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকার সম্প্রতি ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেএটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং নীতিগতভাবে প্রশংসনীয়। তবে প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া গভীরভাবে পর্যালোচনা করে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এটি ক্ষুদ্রঋণ খাতের বাস্তবতা ও সেক্টরের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে গত কয়েক দশকে ক্ষুদ্রঋণ খাতের অর্জন এবং দেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নে এই খাতের ইতিবাচক ভূমিকা গুরুতরভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অধ্যাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকে রূপান্তরের যে ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান একটি উন্নয়নভিত্তিক, অ-লাভজনক এবং দরিদ্রবান্ধব প্রক্রিয়ায় পরিচালিত ব্যবস্থা, যেখানে ব্যাংক মূলত মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। প্রস্তাবিত এই রূপান্তরের ফলে ক্ষুদ্রঋণ খাত তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং ধীরে ধীরে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।

এ ছাড়াও, কীভাবে বিদ্যমান ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকে রূপান্তরিত হবে, সে বিষয়ে অধ্যাদেশে কোনো সুস্পষ্ট, নির্দিষ্ট বা বাস্তবায়নযোগ্য রূপরেখা নেই। বরং এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে দেশি ও বিদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এমনকি করপোরেট বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক লাইসেন্স গ্রহণের পথ উন্মুক্ত হবে। এর ফলে ক্ষুদ্রঋণ খাতে অনৈতিক চর্চা, অতিরিক্ত মুনাফালোভ এবং সুশাসন সংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এ অবস্থায় আর্থিক খাতের বিদ্যমান সমস্যা যেমন খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব ক্ষুদ্রঋণ খাতেও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা এই খাতের গত কয়েক দশকের অর্জনকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করতে পারে। অধ্যাদেশে ‘একাধিক ব্যক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজস্ব অর্থায়নে’ ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত করার মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানার ধারণা প্রবর্তিত হয়েছে, যা ক্ষুদ্রঋণ খাতের স্বকীয়তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও উন্নয়নকামী চরিত্রকে দুর্বল করবে।

প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে, ক্ষুদ্রঋণ খাতের প্রকৃত চাহিদা এই অধ্যাদেশে প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫ ক্ষুদ্রঋণ খাতবান্ধব নয়। এটি বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করবে না; বরং নতুন করে সংকট সৃষ্টি করবে বলে মনে করেন তারা।