পারমাণবিক শক্তির কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এ নিয়ে অনেকের মধ্যে ভীতি আছে। তবু রোগ শনাক্তকরণে ও চিকিৎসায় নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে নিউক্লিয়ার মেডিসিন (পারমাণবিক চিকিৎসা); ক্যানসার, হৃদরোগ, থাইরয়েড ও স্নায়ুরোগ নির্ণয়ে পারমাণবিক প্রযুক্তি বিশ্ব জুড়েই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে থাইরয়েড ও ক্যানসারের চিকিৎসার পাশাপাশি কিডনি, হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক এবং হাড়, লিভার, ফুসফুস ও প্রোস্টেট ক্যানসার প্রভৃতি জটিল রোগের নিখুঁত নির্ণয়ে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। অনেকটা নীরবে চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপর্ণ কাজ করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাদের ২২টি নিউক্লিয়ার মেডিসিন ইউনিট রয়েছে।
নিউক্লিয়ার মেডিসিনে স্বল্পমাত্রার তেজস্ক্রিয় পদার্থ (রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল) ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। নিউক্লিয়ার মেডিসিন অঙ্গের কার্যক্ষমতা সম্পর্কে তথ্য দেয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ শনাক্তকরণ সম্ভব হয়।
দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি ও জনসচেতনতার অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। দেরিতে চিকিৎসা শুরুর বিষয়টিও জটিলতা বাড়ায়। পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে স্বাস্থ্যসেবায় নিউক্লিয়ার মেডিসিন বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্যানসার নির্ণয়ে ও চিকিৎসায় নিউক্লিয়ার মেডিসিন : বাংলাদেশে ভয়ংকর ব্যাধির নাম ক্যানসার।
চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা, ব্যয় ও দেরিতে শনাক্ত হওয়ার কারণে প্রতি বছর প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। নিউক্লিয়ার মেডিসিন চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যেখানে তেজস্ক্রিয় পদার্থ (রেডিওআইসোটোপ) ব্যবহার চিকিৎসা দেওয়া হয়। পেট সিটি স্ক্যান ক্যানসার শনাক্তে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, পেট সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে ক্যানসার নির্ণয় ও শরীরের কোথায় কী পরিমাণ ছড়িয়েছে এবং চিকিৎসায় রোগী কতটা সাড়া দিচ্ছে, তা নির্ভুলভাবে জানা যায়। ফলে সাশ্রয়ী ব্যয়ে রোগী সঠিক চিকিৎসা পান। সাইক্লোট্রনের সাহায্যে মানব চিকিৎসা ও গবেষণার জন্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ তৈরি করা হয়। এটি মেডিকেল ইমেজিং এবং গবেষণায়ও ব্যবহৃত হয়।
ঢাকার শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল) চত্বরে জাতীয় নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও অ্যালাইড সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটে (নিনমাস) তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে বিভিন্ন রোগীর ক্যানসার শনাক্ত করা হচ্ছে।
সাইক্লোট্রনে উৎপাদিত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আওতাধীন ছয়টি পেট-সিটি সেন্টারসহ বেসরকারি আরও ছয়টি পেট-সিটি সেন্টারে সরবরাহ করা হয়। একটি বেসরকারি হাসপাতালেও স্বল্প পরিসরে পেট রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন-সুবিধা রয়েছে।
ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের (নিনমাস) ইনভিট্রো বিভাগ এবং সাইক্লোট্রনভিত্তিক পেট আইসোটপ ও রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস সিন্থেসিস বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ড. মোহাম্মদ আনোয়ার-উল-আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাইক্লোট্রন এমন রেডিও আইসোটোপ উৎপাদন করে, যা পেট-সিটি পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয়। বেসরকারি হাসপাতালে এ পরীক্ষার খরচ ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা, অথচ আমাদের এখানে ৩০ হাজার টাকার মতো।’
ক্যানসারের ভয়াবহতা ও চিকিৎসায় সীমাবদ্ধতা : ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার পরিচালিত দ্য গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরি (গ্লোবোক্যান) ২০২২ অনুযায়ী, বিশ্বে নতুন আক্রান্ত ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি; মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় পৌনে এক কোটি। বৈশ্বিক বড় ছয় মৃত্যুর কারণের একটি। গ্লোবোক্যানের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে নতুন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি। এ রোগে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যানসার রোগের ব্যাপকতা, ক্যানসার ডায়াগনোসিস, স্টেজিং নির্ধারণ ও চিকিৎসা-পরবর্তী ক্যানসার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বের বিবেচনায় দেশে অন্তত ৫০টি পেট-সিটি সেন্টার দরকার। অথচ পরমাণু শক্তি কমিশন, সরকারি ও বেসরকারি মিলে ১২টি পেট-সিটি সেন্টার এবং ২টি সাইক্লোট্রন রয়েছে। সব পেট-সিটি সেন্টার ও সাইক্লোট্রন ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ। ফলে দূর-দূরান্তের রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক সময় ক্যানসার রোগীর জন্য তিন-চার দিনের অপেক্ষাই বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আনোয়ার-উল-আজিম বলেন, এখানে যারা আসেন তাদের বেশিরভাগই দরিদ্র। প্রত্যন্ত এলাকার লোক, ঢাকায় থাকার জায়গা পর্যন্ত নেই। এসব বিষয় বিবেচনা করে পরমাণু শক্তি কমিশনের আওতায় সাভার, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে আরও তিনটি সাইক্লোট্রন স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে; চালু হবে আগামী বছর। রাজশাহী, খুলনা, রংপুরেও এ সেবা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, আট বিভাগে আটটি ক্যানসার হাসপাতাল করার উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ও এসব স্থানে সাইক্লোট্রন ও পেট-সিটি স্থাপন করার লক্ষ্যে কাজ করছে। আনোয়ার-উল-আজিম বলেন, ক্যানসার শনাক্তকরণে এ প্রযুক্তি অন্যান্য পরীক্ষার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। চিকিৎসককে বেদনাদায়ক পরীক্ষা ও সার্জারি ছাড়াই ক্যানসার নির্ণয় করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে সাহায্য করে।
একজন অনকোলজিস্ট বলেন, অনেক সময় সিটি স্ক্যানে যা ধরা পড়ে না, পেট-সিটিতে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ পরীক্ষায় রোগীর শারীরিক কষ্ট হয় না এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। ক্যানসারের চিকিৎসায় রোগীর কতটা উন্নতি হয়েছে, তা জানতেও এ পরীক্ষা প্রয়োজন।
রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস থেরাপি : নিউক্লিয়ার মেডিসিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস থেরাপি, যা মানবদেহে ক্ষতিকর টিউমার অথবা ক্যানসার কোষে সরাসরি আঘাত করে। রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস ইনজেকশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাত্রার বিকিরণ প্রয়োগ করে সরাসরি টার্গেটেড ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা যায়। এতে আশপাশের সুস্থ কোষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কম। রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস থেরাপি ‘পার্সোনালাইজড চিকিৎসা পদ্ধতি’ হিসেবে উন্নত বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নিউক্লিয়ার চিকিৎসা নিয়ে এখনো নানা ভুল ধারণা আছে। কারণ, অনেকেই মনে করেন, রেডিয়েশন মানেই বড় ঝুঁকি।
থাইরয়েড চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত : ঘাড়ের সামনের ছোট একটি গ্রন্থি, যার নাম থাইরয়েড। মানবদেহের বিপাকক্রিয়া, বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ ও শক্তি উৎপাদনে এর ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশে থাইরয়েডজনিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে অন্তত একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে থাইরয়েড সমস্যায় ভোগেন। এ রোগ নির্ণয়ে ও চিকিৎসায় সাম্প্রতিককালে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে নিউক্লিয়ার মেডিসিন। সুফল পাচ্ছেন হাজারো রোগী।
হাইপারথাইরয়েডিজম ও থাইরয়েড ক্যানসারের জন্য নিউক্লিয়ার মেডিসিনে ব্যবহৃত রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন থেরাপি নিরাপদ ও কার্যকর সমাধান দিচ্ছে।
নিনমাস ১৯৮০ সাল থেকে রেডিওআয়োডিন থেরাপি সেবা দিচ্ছে এবং নিনমাসেই ১০ হাজারেরও বেশি রোগীকে এ সেবা দেওয়া হয়েছে। নিনমাস ও ২১টি ইনমাসের মাধ্যমে বাংলাদেশে রেডিওআয়োডিন থেরাপি দেয় পরমাণু শক্তি কমিশন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেন, রক্ত পরীক্ষায় অনেক সময় শুধু হরমোনের মাত্রা বোঝা যায়। কিন্তু নিউক্লিয়ার স্ক্যান করলে থাইরয়েড গ্রন্থি কীভাবে কাজ করে, কোথায় সমস্যা তা চোখে দেখা যায়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষজ্ঞ জানান, থাইরয়েড ক্যানসারের রোগীদের দীর্ঘমেয়াদে বেঁচে থাকার হার বাড়াতে নিউক্লিয়ার মেডিসিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্ব পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ : বিশ্ব জুড়ে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের ভবিষ্যৎ ঘিরে আশাবাদ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার মেডিসিন আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হবে। ‘থেরানস্টিক্স’ নামে নতুন একটি ধারণা চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোচনায় এসেছে, যেখানে একই প্রযুক্তি দিয়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা একসঙ্গে করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত হলে স্ক্যান বিশ্লেষণ আরও দ্রুত ও নির্ভুল হবে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় নিউক্লিয়ার মেডিসিন নিয়মিত চিকিৎসা ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশে^র প্রায় চার কোটি রোগীর জন্য নিউক্লিয়ার মেডিসিন প্রয়োগ করা হয়, যার অর্ধেকেরও বেশি শুধু রোগ নির্ণয়ের জন্য। বিশ্ব জুড়ে ১০ হাজারেরও বেশি হাসপাতাল নিউক্লিয়ার মেডিসিন ব্যবহার করে ও ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে এটি নির্ণয়মূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।