বিশ্ব রাজনীতিতে ঘটে গেল এক নজিরবিহীন ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বড় পরিসরের অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, আপাতত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’ যতক্ষণ না একটি ‘নিরাপদ ও যথাযথ রূপান্তর’ সম্ভব হয়। এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে বলেছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেসেরই অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত। আদালত বলেছে, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও দেশের সর্বাঙ্গীণ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য রদ্রিগেসকে এই অবস্থানে বসানো গুরুত্বপূর্ণ। এরপরই ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, তার দেশ কখনোই কোনো দেশের উপনিবেশ হবে না। অবশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি করেছিলেন ডেলসি রদ্রিগেজ তাদের চাওয়া অনুযায়ী কাজ করতে রাজি হয়েছেন। তবে রদ্রিগেজের এই কঠোর বক্তব্য ট্রাম্পের দাবিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ঘটনার সূচনা হয় শনিবার ভোররাতে। মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ইউনিট ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা কারাকাসে মাদুরোর নিরাপদ আবাসস্থলে ঝটিকা অভিযান চালান। এর আগে মার্কিন বিমানবাহিনী দেশটির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে কারাকাস। ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক ঘাঁটি, লা কারলোতা বিমানঘাঁটি, পোর্ত লা গুয়েরা বন্দরসহ একাধিক স্থানে ধোঁয়া ও আগুনের কুণ্ডলী দেখা যায়। প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে জানান, এটি একটি ‘দুঃসাহসিক অভিযান’। তিনি দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়েছেন এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘যদি রদ্রিগেজ আমাদের কথা মেনে চলেন, তাহলে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হবে না। আমরা দেশটি চালাব এবং তেলশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করব। বিশ্বের সেরা তেল কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানাব।’
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে আবার হামলা চালানো হবে। কিন্তু রদ্রিগেজের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি মাদুরোকে ‘একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট’ বলে অভিহিত করেন এবং তার ‘অপহরণের’ তীব্র নিন্দা করেন। ভেনেজুয়েলার পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে রদ্রিগেজ বলেন, ‘আমাদের দেশ কখনো কোনো দেশের উপনিবেশ হবে না। যা ঘটেছে তা বেআইনি শক্তির অপব্যবহার। বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে এমন হতে পারে।’
তিনি জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা শান্তি ও স্থিরতার মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে নেব।’ ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট মাদুরোকে ‘সাময়িকভাবে অক্ষম’ ঘোষণা করে রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দিয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু রদ্রিগেজ মাদুরোর মুক্তির দাবি জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও ‘বহিরাগত আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছেন।
বিবিসি জানাচ্ছে, অভিযানের পরিকল্পনা ছিল মাসব্যাপী। সিআইএর একটি দল গত বছর থেকে ভেনেজুয়েলায় গোপনে কাজ করছিল। মাদুরোর ঘনিষ্ঠ এক তথ্যদাতার সাহায্যে তার গতিবিধি নজরে রাখা হয়। ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা মাদুরোর নিরাপদ আবাসের হুবহু প্রতিকৃতি তৈরি করে মহড়া দেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও সিআইএ প্রধান জন র্যাটক্লিফ এই ‘কোর টিম’ গঠন করেন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনি দিক থেকে এই অভিযান বিতর্কিত। চ্যাথাম হাউসের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ মার্ক ওয়েলার বলেছেন, মাদক পাচারের অভিযোগে বিদেশি নাগরিককে আটকের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের থাকলেও এভাবে সশস্ত্র আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তিনি বলেন, একমাত্র বৈধ পথ ছিল জাতিসংঘের ম্যান্ডেট, যা পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’ এই দাবিকে তিনি ‘অদ্ভুত’ বলে অভিহিত করেন।
এদিকে এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তীব্র। চীন এটিকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে মাদুরোর মুক্তি দাবি করেছে। রাশিয়া ও কিউবা নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে এটিকে ‘বিপজ্জনক নজির’ বলেছেন। অন্যদিকে, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য মাদুরোর অপসারণকে স্বাগত জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ওয়াশিংটন, নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভ হয়েছে। অনেকে ট্রাম্পকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে অভিহিত করেছেন। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যানরা এটিকে ‘তেলের জন্য রক্তপাত’ বলে সমালোচনা করেছেন। ভেনেজুয়েলার প্রবাসীরা উল্লাস করলেও যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলো প্রতিবাদ করছে।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলায় পরিস্থিতি এখন অস্থির। ইলন মাস্কের স্টারলিংক বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু মাদুরোর অনুগতরা এখনো ক্ষমতায়। রদ্রিগেজের নেতৃত্বে প্রতিরোধের প্রস্তুতি চলছে। ট্রাম্পের ‘নিয়ন্ত্রণ’ কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে ভেনেজুয়েলা দখল সহজ হবে না এটাই এখন স্পষ্ট।
এ ঘটনা বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে : শক্তির ভাষা কতদূর যেতে পারে? ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। জনগণের ধৈর্য ও আন্তর্জাতিক চাপই নির্ধারণ করবে পরবর্তী অধ্যায়।