ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী, নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো ঘোষণা করেছেন, তার দেশ ভেনেজুয়েলা হবে আমেরিকার জ্বালানিকেন্দ্র। গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন মাচাদো। সাক্ষাৎকারে দ্রুত দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে মাচাদো নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করে তার সঙ্গে নোবেল পুরস্কার ভাগাভাগি করার কথা জানিয়েছেন তিনি। এদিকে, ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চলতি সপ্তাহেই বৈঠকে বসতে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলাকে যেন অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। অন্যদিকে, ট্রাম্পের হুমকির জবাবে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কলম্বিয়ার বামপন্থি প্রেসিডেন্টে গুস্তাভো পেত্রো। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন।
গত শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে নজিরবিহীন এক সামরিক অভিযান চালিয়ে নিউইয়র্কে তুলে আনা হয় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে। এই প্রেক্ষাপটে গত সোমবার ফক্স নিউজকে সাক্ষাৎকার দেন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী নোবেলজয়ী মাচাদো। যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর হাতে মাদুরোর আটক হওয়ার ঘটনাকে ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতার জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন মাচাদো। তিনি মনে করেন, ‘৩ জানুয়ারি’ মাদুরো আটক হওয়ার তারিখটি তার দেশের ইতিহাসে ‘ন্যায়বিচারের কাছে অত্যাচারের পরাজয়ের’ দিন হিসেবে চিহ্নিত হবে। ফক্স নিউজের শন হ্যানিটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাচাদো ঘোষণা দেন, আমরা ভেনেজুয়েলাকে আমেরিকার জ্বালানিকেন্দ্রে রূপান্তর করব।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুদ রয়েছে লাতিন আমেরিকার এই দেশটিতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেরই ধারণা, বিশাল এই তেলের মজুদের নিয়ন্ত্রণ পেতেই মাদুরো সরকারের পতন ঘটিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এবারে সেই সম্ভাবনার পালেই যেন হাওয়া দিলেন পশ্চিমাদের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত মাচাদো। ফক্স নিউজের সঙ্গে ভেনেজুয়েলা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন মাচাদো। তার কাছে স্বাধীন ও মুক্ত ভেনেজুয়েলার অর্থ কীÑ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি মুক্ত ভেনেজুয়েলা মানে প্রথমত. একটি নিরাপত্তা সহযোগী রাষ্ট্র; যা দক্ষিণ আমেরিকার অপরাধমূলক কেন্দ্রগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়ে একে একটি নিরাপত্তা ঢালে পরিণত করবে। আমাদের জনগণ এবং আমেরিকার জনগণের যে বিশাল ক্ষতি এই অপরাধী চক্রগুলো করেছে, তাদের নির্মূল করতে ভেনেজুয়েলাই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র।
তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয়ত. আমরা ভেনেজুয়েলাকে আমেরিকার জ্বালানিকেন্দ্রে পরিণত করব। আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করব, বাজার উন্মুক্ত করব এবং বিদেশি বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। তৃতীয়ত. আমরা সেই লাখ লাখ ভেনেজুয়েলানের নিজ দেশে ফিরিয়ে আনব যারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, যাতে তারা একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ দেশ এবং একটি মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারেন। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। ভেনেজুয়েলাকে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্রে পরিণত করার সংকল্পের কথাও জানিয়েছেন মাচাদো।
এদিকে, ভেনেজুয়েলায় জ্বালানি তেল উৎপাদন বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চলতি সপ্তাহেই বৈঠকে বসতে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতে প্রায় দুই দশক আগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আবারও সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় তিনটি তেল কোম্পানি এক্সন মবিল, কনোকো ফিলিপস এবং শেভরনের চার নির্বাহী জানিয়েছেন, মাদুরোর অপসারণ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে এখন পর্যন্ত তাদের কোনো কথা হয়নি। অথচ গত সপ্তাহান্তেই ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মাদুরোকে আটকের আগে ও পরে তিনি দেশটির সব তেল কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গত সোমবার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনার সতর্ক সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, আঙ্কারা আন্তর্জাতিক আইনের সব ধরনের লঙ্ঘনের বিরোধী। মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক শেষে এরদোয়ান বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, এমন কোনো পদক্ষেপ সমর্থন করি না। অন্য কোনো দেশের সার্বভৌম অধিকার ক্ষুণœ করা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে পদদলিত করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ; যা বিশ্ব জুড়ে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে দেশ দুটির কূটনীতিকরা এই নিন্দা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে তারা মাদুরো দম্পতির মুক্তি দাবি করেন।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলম্বিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা তুঙ্গে পৌঁছেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অব্যাহত হুমকির মুখে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো প্রয়োজনে আবারও অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় পেত্রো বলেন, আমি শপথ নিয়েছিলাম আর কখনো অস্ত্র ছুঁয়ে দেখব না... কিন্তু মাতৃভূমির প্রয়োজনে আমি আবারও অস্ত্র হাতে তুলে নেব। কলম্বিয়ার প্রথম বামপন্থি পেত্রো একসময় গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন। ১৯৮৯ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে তার দল এম-১৯ অস্ত্র সমর্পণ করেছিল। গত বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে পেত্রোর সঙ্গে তার বাগযুদ্ধ চলছে।
অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের অবজ্ঞা : জাতিসংঘ
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিকে অবজ্ঞা’ বলে মন্তব্য করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন (ওএইচসিএইচআর)। এই মন্তব্য এসেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের পর, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্র দেশও ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। খবর : বিবিসি বাংলা
জেনেভায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের পর মানবাধিকার কমিশনের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি সাংবাদিকদের বলেন, কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখ-তা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া বা বলপ্রয়োগ করা উচিত নয় অন্য কোনো দেশের। এটি আন্তর্জাতিক আইনের অবজ্ঞা।