মেয়র, যুগ্ম সচিবের বিরুদ্ধে মামলা করতে গড়িমসি

কক্সবাজরের ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে গিয়ে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন। পরে সংস্থাটির উপপরিচালক আলী আকবরকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় যায়। পরে অভিযুক্ত ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। কিন্তু দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিশন আমলাদের রক্ষায় মামলার অনুমোদন দেননি। উল্টো অভিযোগটি পুনরায় অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য একজন উপপরিচালককে দায়িত্ব দেন। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মামলা করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তের তালিকায় কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেয়র মুজিবুর রহমান ও কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক (পরে যুগ্ম সচিব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়) মো. কামাল হোসেনসহ কয়েকজন আমলার নাম থাকায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গড়িমসি করছে সংস্থাটি।

জানা গেছে, কক্সবাজারের উন্নয়নে সরকার তিন লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭২টি প্রকল্প গ্রহণ করে। এর মধ্যে তিনটি প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। পরে দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনকে কক্সবাজার পানি শোধনাগার প্রকল্পসহ তিনটি প্রকল্পের দুর্নীতির অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার অনুসন্ধানে কক্সবাজার পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান ও তার আত্মীয়স্বজন, সরকারের আমলা, রাজনীতিকসহ অনেক প্রভাবশালীর সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। অনুসন্ধান কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেন। কিন্তু কমিশন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন না দিয়ে, তিনটি অভিযোগের বিষয়ে পুনঃঅনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়। নির্দেশনা অনুযায়ী কক্সবাজার পানি শোধনাগার প্রকল্পের দুর্নীতির পুনঃঅনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) মো. আলী আকবরকে। তিনি অনুসন্ধান শেষ করে ২০২২ সালের ১২ মে দুদকে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেন।

প্রতিবেদনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান, কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক (পরে যুগ্ম সচিব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়) মো. কামাল হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (পরে উপসচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) আশরাফুল আফসারসহ মোট ৩৭ জনকে আসামি করার সুপারিশ করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের সাবেক উপপরিচলক মো. আলী আকবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি অনুসন্ধান শেষ করে মামলার সুপারিশসহ কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। কিন্তু কমিশন তার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মামলা করতে অনুমোদন দেয়নি। অভিযুক্তরা ঘুষের বিনিময়ে মামলা থেকে রক্ষা পেতে তদবির করেছে। এতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করে কমিশন পুনরায় অনুসন্ধানে নামে। এরপর কী হয়েছে সেটি জানা নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, এ অভিযোগের পুনঃঅনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সম্প্রতি একজন উপপরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি অনুসন্ধান শেষ করে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। ওই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে কমিশন।

জানা গেছে, ২০১৫ সালে কক্সবাজার পৌরসভার তৎকালীন মেয়র সরওয়ার কামাল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় কক্সবাজার পানি শোধনাগার প্রকল্পের জন্য বাঁকখালী নদীর উত্তরপাড়ে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা মূল্যের জমি বাছাই করেন। তিনি দায়িত্ব থেকে চলে যাওয়ার পর নতুন করে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুজিবুর রহমান। তিনি প্রকল্প নির্মাণে আগের বাছাই করা জমি বাদ দিয়ে বাঁকখালী নদীর দক্ষিণপাড়ে ৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা মূল্যের জমি বাছাই করেন। নতুন করে যে জমি বাছাই করা হয়েছে তার বেশির ভাগই ছিল সরকারি রিসিভারে থাকা জমি। মেয়র কৌশলে জমি অধিগ্রহণের আগে রিসিভারকৃত জমির ১ দশমিক ৭২ একর তার স্ত্রী ও শ্যালকের নামে বক্তিগত জমিতে রূপান্তর করেন। সরকারি রিসিভারকৃত জমি ব্যক্তির জমিতে রূপান্তর করতে মেয়রকে সহায়তা করেন কক্সবাজার সদরের সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরিয়ার মোক্তারসহ আরও দুজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও জেলার বিভিন্ন পদের কর্মকর্তারা। ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এ অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, অসৎ উদ্দশ্যে একে অন্যের সহযোগিতায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে জালজালিয়াতির আশ্রয়ে নিজেরা লাভবান হয়ে এবং অন্যকে অন্যায়ভাবে লাভবান করতে অধিগ্রহণ আইন অমান্য করে ২০১৫ সালের ১৮ মে কক্সবাজার জেলার এলএ মামলার (নং-০৪/১৯-২০) প্রস্তাবিত বাঁকখালী নদীর উত্তরপাড়ের জমি গ্রহণ না করে সরকারি অর্থের অপচয়, কারচুপি ও আত্মসাতের উদ্দেশ্যে বাঁকখালী নদীর দক্ষিণপাড়ে ৩০ গুণ বেশি মূল্যের জমিতে প্রকল্প নির্মাণের পদক্ষেপ নেয়। এরপর ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বৈঠক ডেকে ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এতে কক্সবাজার পৌরসভা প্রত্যাশী সংস্থা না হওয়া সত্ত্বেও মেয়র মুজিবুর রহমান অবৈধভাবে প্রত্যাশী সংস্থা দেখান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের জন্য বাছাই করা জমির ২ দশমিক ১৯ একরের মধ্যে ১ দশমিক ৭২ একর জমি মেয়র মুজিবুর রহমান পূর্বপরিকল্পিতভাবে মোহাম্মদ শাহরিয়ার মুক্তারসহ দুজন সহকারী কমিশনের যোগসাজশে আদালতের রিসিভারি থাকা জমি মেয়রের স্ত্রী ফারহানা আক্তার ও স্ত্রীর বড় ভাই মিজানুর রহমানের নামে দখল দেখিয়ে ছয়টি নামজারির মাধ্যমে ব্যক্তিগত জমিতে রূপান্তর করেন। একইসঙ্গে নামজারি ও জমাভাগের মামলার (মামলা নং-৪১৭০/২০১০) মূলনথি গায়েব করে দেন। এ ছাড়া প্রত্যাশী সংস্থার প্রতিনিধি না হয়েও সরেজমিনে পরিদর্শন ছাড়াই ফিন্ড বুকে স্বাক্ষর, অধিগ্রহণ নথির নোটশিটের আদেশে (নং-০৬, তারিখ-১১/১১/২০১৯) রিসিভারি মামলা ও গোলাভাগের মামলা রয়েছে জেনেও তা নিষ্পত্তি না করা, প্রত্যাশী সংস্থা নির্ধারণ না করে এবং ২০১৯ সালের ২৭ অক্টোবরের দায়ের করা রিট পিটিশনের (নং-১৪৬৮১/২০১৯) আদেশকে মিসগাইড করে সরকারি কৌশলী মোহাম্মদ ইসহাকের সহায়তায় মিজানুর রহমানকে ২০২০ সালের ৯ জুলাই জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭ কোটি ১৬ লাখ ৮৯ হাজার ৭৯৪ টাকা অবৈধভাবে প্রদান করা হয়। এ ছাড়া জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এলএ শাখার দালাল মো. সালাউদ্দিনের কাছ থেকে ঘুষ ও কমিশন হিসেবে মেয়র মুজিবুর রহমান চার লাখ ৫০ হাজার এবং তার ছেলে হাসান মেহেদী রহমান ৩ লাখ টাকা নেন। এ ছাড়া বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত জসিম উদ্দিন গং ক্ষতিপূরণ বাবদ ২ কোটি ২২ লাখ চার হাজার ১৮৭ টাকা পান এবং সেই টাকা থেকে কমিশন বাবদ ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে নেন মেয়র মুজিবুর। এ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকার চেক দেন স্ত্রীর ভাই মিজানুর রহমানকে। দুদকের অনুসন্ধানে দালিলিক ও সাক্ষ্য প্রমাণে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় ৩৭ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে তারা হলেন কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মজিবুর রহমান, কক্সবাজারের সাবেক ডিসি মো. কামাল হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার, সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পরে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এএইচএম মাহফুজুর রহমান, সাবেক সহকারী কমিশনার ভূমি মোহাম্মদ নূর হোসেন, কক্সবাজার ভূমি অফিসের সাবেক কানুনগো বাচ্চু মনি চাকমা, সাবেক ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মিজবাহ উদ্দিন, কক্সবাজার সদরের সাবেক সহকারী কমিশনার রাশেদুল ইসলাম, সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পরে সিনিয়র সহকারী সচিব (সাময়িক বরখাস্ত) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নাজিম উদ্দিন, উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো বসন্ত কুমার চাকমা, ইউনিয়ন সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাহেদ ও আবুল হোছাইন, ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সৈয়দ নূর, উপজেলা ভূমি অফিসের রেকর্ডকিপার জসীম উদ্দিন, সার্ভেয়ার মো. জাহাঙ্গীর আলম, ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জায়েদ হোসাইন, সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ শাহরিয়ার মুক্তার, সরকারি কৌশলী (জিপি) মোহাম্মদ ইসহাক, কক্সবাজার পৌরসভার সচিব রাছেল চৌধুরী, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মো. শামীম হুসাইন, একই শাখার অতিরিক্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আতাউর রহমান, কানুনগো মো. নুরুল ইসলাম, সার্ভেয়ার মো. জিয়াউর রহমান, সার্ভেয়ার মো. সাইফুল ইসলাম, সার্ভেয়ার আইএম আশরাফুজ্জামান, মেয়রের স্ত্রী ফারহানা আক্তার, স্ত্রীর ভাই মিজানুর রহমান, কক্সবাজারের বাসিন্দা মমতাজুল ইসলাম, মো. মফিজুর রহমান, মাহবুবুর রহমান, খোরশেদা বেগম, সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মোস্তাক আহমেদ, মোসাম্মদ মাহমুদা খাতুন, রেজাউল করিম, মোজাফফর আলী, মো. সালাহউদ্দিন এবং হাসান মেহেদী রহমান।