অধ্যাপক ডা. এম. এস. জহিরুল হক চৌধুরী
ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, ঢাকা
প্রতিটি স্ট্রোক আলাদা। স্ট্রোকের প্রভাবগুলো নির্ভর করে এটি মস্তিষ্কের কোথায় ঘটেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাটি কত বড় তার ওপরে। স্ট্রোক হলে যত দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া যাবে ঝুঁকি তত কমবে। স্ট্রোক হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিতে হয়। বিলম্বে চিকিৎসা নিলে জটিলতা বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানিও ঘটে। এ দেশে বয়স্ক মানুষের মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ স্ট্রোক। মূলত চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তিরা বেশি আক্রান্ত হলেও অল্প বয়সীরাও আক্রান্ত হতে পারে। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তক্ষরণ বা রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে যে ক্ষতি হয়, সেটাই স্ট্রোক। স্ট্রোক থেকে প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত, বিকলাঙ্গ এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
সঠিক জীবনযাত্রা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব। সঠিক ওজন, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণ, চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার, ধূমপান পরিহার এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব। স্ট্রোকের রোগীরা প্রায়ই অনেক দেরি করে হাসপাতালে পৌঁছান। ততক্ষণে রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার আর সময় থাকে না। অথচ সময়মতো চিকিৎসা নিলে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে আনা সম্ভব হলে স্ট্রোকের ধরন অনুযায়ী রোগীর ত্বরিত চিকিৎসা করে তাকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
স্ট্রোকের লক্ষণ সহজে চেনার জন্য বিশ্বব্যাপী ‘বি ফাস্ট বা দ্রুত করুন’ বাক্যবন্ধ ব্যবহার করা হয়। ইংরেজি বি-ফাস্ট শব্দবন্ধ দিয়েই স্ট্রোকের লক্ষণ বা উপসর্গ মনে রাখা সম্ভব।
বি-অর্থ ব্যালেন্স বা ভারসাম্য। হঠাৎ করে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া। ই-অর্থ আই বা দৃষ্টি। হঠাৎ চোখে দেখতে সমস্যা। এফ-অর্থ ফেস বা মুখমন্ডল। হঠাৎ মুখের একদিক বাঁকা হয়ে যাওয়া।এ-অর্থ আর্ম বা বাহু। হঠাৎ করে এক হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া। এস-অর্থ স্পিচ বা হঠাৎ কথা জড়িয়ে আসা। টি-অর্থ টাইম বা সময়।
চিকিৎসা
ওপরের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে তার স্ট্রোক হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে কাছের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে। সম্ভব হলে মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান করে স্ট্রোকের ধরন বুঝতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্ট্রোক দুই ধরনের হয়। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়ার জন্য অথবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের জন্য এবং যার চিকিৎসা পদ্ধতিও ভিন্নতর। রোগী যদি অজ্ঞান হয়ে যায় তাহলে শ্বাসনালি, শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন নিয়মিত রাখা। রোগীকে একদিকে কাত করে, বালিশ ছাড়া মাথা নিচু করে শোয়াতে হবে। চোখের যত্ন নিতে হবে। মূত্রথলির যত্ন (প্রয়োজনে ক্যাথেটার দিতে হবে)। খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্টোক হওয়ার পর প্রতিটি মুহূর্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ, দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে মস্তিষ্কের লাখ লাখ নিউরন বাঁচানো সম্ভব। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, সুস্বাস্থ্যকর দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন স্ট্রোক হওয়া প্রতিরোধ করা যায়।