বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। যেকোনো মূল্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে। এ জন্য মতপার্থক্য ভুলে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় বাংলাদেশের ফিরে যাওয়ার আর সুযোগ নেই।’
গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় বনানীতে হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানস্থলে এসেই তারেক রহমান সম্পাদক ও সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সঙ্গে ছিলেন। ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে এটি তার প্রথম মতবিনিময়। সভায় সম্পাদকরা গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। পরে দেশের মানুষের জন্য নিজের কর্মপরিকল্পনা সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরে সবার সহযোগিতা চান তারেক রহমান।
চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন এই মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান বলেন, ‘হিংসা-প্রতিশোধের পরিণতি কী হতে পারে, সেটা আমরা দেখেছি চব্বিশের ৫ আগস্ট। মতপার্থক্য যেন মতবিভেদে রূপ না নেয়, বিভেদের কারণ না হয়। সবাই মিলে কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সামনে আমাদের অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ আছে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন মতপার্থক্য আছে। এসব মতপার্থক্য নিয়ে যেন আলোচনা হয়সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে আহ্বান জানাই। আমাদের সমস্যা ছিল, সমস্যা আছে। আমরা অবশ্যই ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাই না।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘দেশে ফিরে আসার পর সাভারসহ কয়েকটি জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, নতুন প্রজন্ম একটি গাইডেন্স চাইছে। নতুন প্রজন্ম একটি আশা দেখতে চাইছে। ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এই সবগুলোকে সামনে রেখে আমরা যদি দেশের জন্য কাজ করি, দেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করি, তাহলে নিশ্চয়ই সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হব।’
তিনি বলেন, ‘একজন সাংবাদিক নারীর নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেছেন। আমি মনে করি, নারী-পুরুষ উভয়েরই নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় বাংলাদেশের ফিরে যাওয়ার আর সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অনেক মতপার্থক্য আছে। মতপার্থক্য থাকবে। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সবাইকে বলি আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা চালু রাখতে হবে। জবাবদিহিতার জায়গা থাকতে হবে। ২২ জানুয়ারি থেকে আমাদের পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের কাছে যাব। আপনাদের কাছ থেকে আলোচনা-সমালোচনা পাব, যাতে দেশের মানুষের সমস্যা সমাধানের কাজে লাগানো যায়।’
এ সময় তারেক রহমান ভবিষ্যতে বিএনপির দেশ পরিচালনার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিশেষ করে নারী উন্নয়ন, ফ্যামিলি কার্ড, দুর্নীতি, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কল্যাণ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সংস্কার নিয়ে তার ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আগামী ২২ তারিখ থেকে আমরা আমাদের সব রকম পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের সামনে যাব।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘দেশে প্রায় দেড় কোটি কৃষক আছেন। তাদের জন্য ‘অ্যাগ্রি কার্ড’ চালুর ভাবনা রয়েছে। যারা ২০ কোটি মানুষের খাবারের সংস্থান করছেন, সেই বিপুল জনগোষ্ঠীর সমস্যার বিষয়গুলো আমাদেরই জানতে হবে।’
নারীশিক্ষায় মা ও দেশের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘পরের সরকার গঠন করতে পারলে শিক্ষিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।’
স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে প্রিভেনশন মডেল অনুসরণ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষকে সচেতন করা গেলেকোন খাবার না খেলে কিডনি, হার্ট বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমেতাহলে রাষ্ট্রের ব্যয় কমে, মানুষও সু¯’ থাকে। এ নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা আছে।’
সভায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দেশের অগ্রগতি নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরে যা বললেন সম্পাদকরা : অনুষ্ঠানে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, ‘আমরা গণতন্ত্র চাই, স্বাধীন সাংবাদিকতা চাই এবং সুশাসন চাই।’ তিনি বলেন, ‘কিš‘ একটি দুটি বিষয়ে মনে হয়, যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না। সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো কী। আমি মনে করি, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্লাইমেট চেঞ্জ।’ এ ছাড়া ইটিভির চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম, যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়নের কথা তুলে ধরেন।
মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আজকের বাংলাদেশ অস্তিত্ব সংকটে যেভাবে পড়ে যাচ্ছে, সেই সংকট থেকে যে উগ্রবাদ আমাদের গ্রাস করার চেষ্টা করছে সেই উগ্রবাদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে তারেক রহমান ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনো বিকল্প নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা লিখতে চাই। আমরা বলতে চাই। মিডিয়া ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর অনেকটাই স্বাধীন। অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত।’ কেন নিয়ন্ত্রিত তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘মব ভায়োলেন্সের কারণে আমরা অনেকটাই সাহসী হতে পারছি না। আমাদের হাত-পা বাঁধা হয়ে যাচ্ছে। মিডিয়া, সংবাদপত্র অফিসে যখন আগুন দেওয়া হয় তখন কিন্তু ভাবতে কষ্ট লাগেআমরা জাহান্নামে আছি, না বেহেশতে আছি!’
সম্পাদক ও সাংবাদিকদের বক্তব্যের পর সংবাদমাধ্যম নিয়ে আগামী দিনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘ভবিষ্যতে সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা থাকবে। আমি দেশে না থাকতে পারলেও সারাক্ষণ যোগাযোগ রেখেছি। সবার তথ্য রাখার চেষ্টা করেছি। গত ১৬ বছরে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের কথা আমি জানি। পাশাপাশি আমার নেতাকর্মী এবং আমার মা নির্যাতনের শিকারের বড় উদাহরণ।’
সভায় একজন সাংবাদিক নেতা তারেক রহমানকে ‘মাননীয়’ বলে সম্বোধন করলে প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘দয়া করে আমার নামের আগে মাননীয় সম্বোধন করবেন না।’
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল ও চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশের কঠিন সময়ে সারা দেশের মানুষ বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছে।’ তিনি বলেন, ‘বেশ কঠিন সময়ে তারেক রহমান ১৭ বছর পর দেশে এসেছেন। সবাই প্রত্যাশা করছেন তার কাছে। জনগণ বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছে। উদারপন্থি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের আশায় গোটা জাতি।’ মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ইতিমধ্যে দূর থেকে তিনি (তারেক রহমান) ডিজিটালি যে সব কথা আমাদের সামনে বলেছেন, জাতির সামনে বলেছেন; গোটা জাতি আজকে অনেক বেশি আশান্বিত হয়েছেন। আশান্বিত হয়েছি এজন্যই, এবার একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে সত্যিকার অর্থেই উদারপন্থি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা সৃষ্টি করতে পারব।’ এ সময় তিনি সাংবাদিক নেতাদের মন খুলে কথা বলতে অনুরোধ করেন। শুরুতে বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন বিএনপি মহাসচিব।
সম্পাদকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম, নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ইটিভির চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম, ইউএনবির প্রধান সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ খান, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, বিডিনিউজ২৪ ডটকমের প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, দেশ রূপান্তর সম্পাদক কামাল উদ্দিন সবুজ, যুগান্তরের সম্পাদক ও বিএনপির উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য কবি আব্দুল হাই শিকদার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এডিটর ইনাম আহমেদ, দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক মাহাবুবুল আলম, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) চেয়ারম্যান আনোয়ার আল দীন, প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ, রয়টার্সের সিনিয়র সাংবাদিক রুমা পল, জাগো নিউজ ২৪ ডটকম-এর সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক, নাগরিক টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক নবীন হোসেন, বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু, ঢাকা স্টিমের সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ, ঢাকা মেইলের সম্পাদক হারুন জামিল, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সুবহান, ঢাকা পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল ইসলাম প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালাম, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহাদী আমীন, মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমার রুমন, শাম্মী আখতার, শায়রুল কবির খান, আবু সায়েম, বিএনপির সাইমুম পারভেজ, শামসুদ্দিন দিদার, চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার এবং চেয়ারম্যানের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুল ইসলাম।