উইকিপিডিয়া থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে জুলাই শহীদদের পেজ!

অনলাইন বিশ্বকোষ হিসেবে খ্যাত উইকিপিডিয়া থেকে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক মুছে ফেলা হচ্ছে জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও নেতাদের পাতা। ‘নি৭’ ধারা (অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নীতিমালা) ব্যবহার করে পেশাদারভাবে লেখা ও তথ্যসূত্রযুক্ত পাতাগুলো মুছে ফেলার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে প্ল্যাটফর্মটির নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে।

চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম ও ফয়সাল আহমেদ শান্তের স্মরণে তৈরি পাতাগুলো যথাযথ তথ্যসূত্রসহ সম্পাদনা করা হলেও ‘নি৭’ ধারা বলে মুছে ফেলা হয়েছে।

জুলাই শহীদ ইমতিয়াজ আহমেদ জাবিরের পাতাও একই পন্থায় অপসারণ করা হয়েছে।

জুলাই বিপ্লবের প্রায় সকল শহীদের পাতাই একইভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। কেবল আবু সাইদ ও মুগ্ধের পাতা এখনো টিকে আছে, যদিও সেগুলোও নিয়মিত মুছে ফেলার চেষ্টার মুখে।

পাতাগুলোর লেখক দীর্ঘ ৬ বছরের অভিজ্ঞতাসহ শতাধিক কনটেন্ট সম্পাদনাকারী। তিনি জানান, পাতাগুলোতে বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে দেওয়া শহীদদের জীবনী সূত্রসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রশাসকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া সত্ত্বেও কোনো জবাব মেলেনি। বরং পাতাগুলো দ্রুত অপসারণ করে লেখককে ‘বিরক্ত না করতে’ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা দল, সংগঠন ও নেতাদের পাতাও একই রকম টার্গেটের শিকার-

  • জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পাতা বিতর্ক তৈরি করে অপসারণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
  • সাদিক কায়েম, শরীফ ওসমান হাদি, আলী আহসান জুনায়েদ, রাকিবুল ইসলাম রাকিব, নাছির উদ্দিন নাছির, নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাহিদুল ইসলাম, রাশেদ খান, আব্দুল হান্নান মাসুদসহ বহু নেতার পাতা একাধিকবার মুছে ফেলা হয়েছে ‘নি৭’ ধারার অজুহাতে।
  • ইনকিলাব মঞ্চের শরীফ ওসমান হাদির পাতা তার শাহাদাতের পর ফিরিয়ে আনা হলেও আগে বারবার মুছে ফেলা হয়েছিল।
  • ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের পাতা কমপক্ষে ১৩ বার মুছে ফেলার পর সম্প্রতি ফিরে এসেছে।
  • নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের নামে বাংলা ও ইংরেজিতে তিনটি পাতা বহাল রয়েছে, যেখানে তার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ সেসব পাতায় উল্লেখ নেই।

জুলাই শহীদদের পক্ষে লেখা ও মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় একাধিক ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

প্রশাসক ইয়াহইয়াকে ইমেইলে প্রশ্ন করায় তিনি উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারীর অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করেন।

নিয়মিত উইকিলেখক মামুন হোসেনের মতে, ‘বাংলা উইকিপিডিয়া’ একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাধ্যমে পরিচালিত, যা সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। ভারতের শাসকগোষ্ঠীর আদর্শিক মনঃপূত লেখালেখির বিশেষ কদর রয়েছে এখানে।

লেখক হাসনাত সিদ্দিকী মুরাদ বলেন, বাংলা উইকিপিডিয়াকে কোনো অবস্থাতেই উন্মুক্ত বিশ্বকোষ বলা যায় না। এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ধর্ম ও আদর্শিক অবস্থানের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠীর হাতে নিয়ন্ত্রিত।

জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, ১৫ বছর আওয়ামী লীগ যে কাজ করে গেছে, সেটা ব্যক্তিউদ্যোগে মোকাবিলা করা কঠিন। সরকারের দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। অন্তর্বর্তী সরকার যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে যেসব আইডি থেকে এই কাজ করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, উইকিপিডিয়া ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা পরিচালিত, সরকার দ্বারা নয়। তাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হবে উইকিপিডিয়া কমিউনিটির সঙ্গে কথা বলে একটি করণীয় নির্ধারণ করা। এ বিষয়ে করণীয় নিয়ে আমাদের উপদেষ্টাদের সঙ্গে কথা বলব।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের পর থেকে ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মতো উইকিপিডিয়াতেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালানো হয়। তখন থেকেই বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসকদের মধ্যে ভারতীয়, আওয়ামী লীগ-সমর্থক ও ইসলামবিদ্বেষী ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঘটে। তাদের কারণেই মাধ্যমটির নিরপেক্ষতা নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে।