ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ গড়িয়েছে দ্বিতীয় সপ্তাহে। বৃহস্পতি ও শুক্রবারের মতো শনিবার রাতেও সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে। বিক্ষোভকারীদের আল্লাহর শত্রু আখ্যা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দিয়েছে দেশটির ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকার। গত শনিবার ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের বিবৃতিতে বিক্ষোভে যারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন, তাদের মৃত্যুদণ্ডের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। বলা হয়, ইরানের সংবিধানে আল্লাহর শত্রুদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। বিক্ষোভ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ইরান সরকার। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে মাঠে নেমেছে ইরানে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। দেশ জুড়ে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে আইআরজিসি বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। দেশের নিরাপত্তা ও ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের অর্জনগুলো রক্ষা করবে তারা। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সহিংসতায় হতাহত ও আটকের সংখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বিক্ষোভ দমনে সহিংসতায় দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। এদিকে, ইরানের বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লেখেন, ইরান এখন স্বাধীনতা চায়, যা সম্ভবত অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা ও চলমান অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েল। তবে হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলে ওয়াশিংটনকে সাবধান করেছে তেহরান।
গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর দুই সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে, কিন্তু দ্রুতই তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। প্রতিবাদকারীদের কেউ কেউ এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র শেষ করার ডাক দিচ্ছেন। ইরানে বিক্ষোভ দমনে মাঠে নেমেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। আইআরজিসি ইরানের সেনাবাহিনী থেকে পৃথক একটি বিশেষ বাহিনী। বাহিনীটির অভিযোগ ‘সন্ত্রাসীরা’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থার ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে, সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তাকর্মীদের হত্যা করছে এবং সম্পত্তি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও বলেছে, তারা জাতীয় স্বার্থ, দেশের কৌশলগত অবকাঠামো ও জনসম্পত্তি রক্ষা করবে এবং সুরক্ষা দেবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, রাতে পশ্চিম তেহরানের কারাজে একটি পৌরসভা ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তেহরানের চিকিৎসকরা বলেছেন, রাজধানীর মাত্র ছয়টি হাসপাতালে অন্তত ২১৭ বিক্ষোভকারীর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এসব হাসপাতালে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই গুলিবিদ্ধ ছিলেন। হাসপাতালগুলোতে হতাহতদের ভিড় উপচে পড়ছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো নিহতের সংখ্যা এর অনেক কম। ইরানে চলমান বিক্ষোভ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত শনিবার পশ্চিম লন্ডনে ইরানের দূতাবাস প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ হয়েছে। এদিন কয়েকশ বিক্ষোভকারী দূতাবাস ভবনের বাইরে জড়ো হন। তাদের হাতে ছিল ইরানের রাজতন্ত্রের আমলের পতাকা। তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়েছেন। এ সময় একজন দূতাবাস ভবনের বারান্দায় উঠে ইরানের পতাকা নামিয়ে ফেলেন। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ বলেছে, প্রতিবাদের সময় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনুপ্রবেশের অভিযোগে কর্মকর্তারা অন্য একজনকে খুঁজছেন।
ইরানে ট্রাম্পের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে জল্পনা : ইরানে এই বিক্ষোভ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা বেড়েছে। বিক্ষোভকারীদের দমনে সহিংসতার ঘটনায় দেশটিতে ফের হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরান স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে, যুক্তরাষ্ট্রও সাহায্য করতে প্রস্তুত। নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নাম প্রকাশ না করা মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ট্রাম্পকে ইরানে হামলার সামরিক বিকল্পগুলো দেখানো হয়েছে, যদিও তিনি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প হামলার অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি ‘গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা’ করছেন এবং তেহরানে সামরিক নয়, এমন লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাতের বিকল্পও আলোচনায় রয়েছে। তবে ইরানের অভিযোগ, দেশটির শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে সহিংস ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে রূপ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে মাশা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে যে গণআন্দোলন হয়েছিল, তারপর এটিকে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হামলা হলে পাল্টা জবাব : ইরান
ওয়াশিংটন হামলা চালালে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো তেহরানের ‘বৈধ নিশানায়’ পরিণত হবে বলে হুঁশিয়ার দিয়েছে ইরান। ইরানে বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপের আভাসের জবাবে এ ঘোষণা দিল তেহরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভকারীদের ট্রাম্পের সহায়তা করার মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল রবিবার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, হামলা হলে পাল্টা জবাব দেবে তেহরান। গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরান ১২ দিনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়েছিল। এই লড়াইয়ে ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলাও চালায়।
সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় ইসরায়েল : ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা ও চলমান অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় (হাই অ্যালার্ট) রয়েছে ইসরায়েল। ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন ইসরায়েলের তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীকে পুরোপুরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইসরায়েলি সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্প্রতি দেশটির নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এই সর্বোচ্চ সতর্কতা কীভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সামরিক গোপনীয়তার স্বার্থে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।