রাখাইনের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে এর শুনানি হয়। ওআইসির সমর্থনে ২০১৯ সালে আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম প্রধান দেশ গাম্বিয়া এই মামলা দায়ের করেছিল। গত এক দশকেরও বেশি সময় পর এটিই প্রথম কোনো গণহত্যা মামলা, যেটির পূর্ণাঙ্গ শুনানি হবে আইসিজেতে। এই মামলাকে ঐতিহাসিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এই মামলার রায় শুধু মিয়ানমারের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে এর প্রভাব গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলাতেও পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিন বিচার চলাকালে আদালতের শুনানিতে বিচারকদের কাছে গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী দাউদা জালো অভিযোগ তুলে বলেছেন, মিয়ানমার সংখ্যালঘু এই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং তাদের জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা সহজ-সরল মানুষ। তারা শান্তিও মর্যাদাপূর্ণ জীবন চেয়েছিল, কিন্তু তাদের ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য নিশানা করা হয়েছে। মিয়ানমার তাদের স্বপ্নকে অস্বীকার করেছে। বাস্তবে তাদের ওপর অকল্পনীয়রকম ভয়াবহ সহিংসতা এবং ধ্বংস চালিয়ে তাদের জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নির্মম আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণের মুখে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয় আর তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গারা নির্বিচার হত্যা, ব্যাপক ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। জাতিসংঘের একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন তদন্ত শেষে সিদ্ধান্তে আসে, ২০১৭ সালে হওয়া ওই সামরিক হামলার সময় ‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে মিয়ানমারের কর্র্তৃপক্ষ জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদন এবং গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তারা দাবি করে, মুসলিম জঙ্গিদের হামলার প্রতিক্রিয়ায় তাদের সামরিক আক্রমণ ছিল একটি বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেছে, এই মামলায় গণহত্যার সংজ্ঞা কী, কীভাবে তা প্রমাণ করা যায় এবং কীভাবে এর প্রতিকার নিশ্চিত করা যায়, এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করবে। এই মামলা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের আওতায় আনা হয়েছে। নাৎসি হলোকাস্টের পর এই সনদ প্রণীত হয়। এতে গণহত্যাকে এমন কর্মকাণ্ড হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার উদ্দেশ কোনো জাতি, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করা।