কমিশনের সুপারিশের অপেক্ষায় নতুন বেতন কাঠামো

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো (নবম পে-স্কেল) নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পে-কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই বহুল আলোচিত নতুন পে-স্কেলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কমিশন বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করছে এবং শিগগিরই সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে।

জানা যায়, আর্থিক সংকট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় বর্তমান সরকার বেতন কাঠামো ঘোষণা বা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তবে সংশ্লিষ্ট কমিশন এ-সংক্রান্ত নির্ধারণের কাজ শেষ পর্যায়ে। ২১ জানুয়ারি কমিশনের চূড়ান্ত সভা হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় নতুন বেতন কাঠামোসংক্রান্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হতে পারে, যা প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করবে কমিশন।

এ প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা জানান, কমিশনের কাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। বিভিন্ন পক্ষ কমিশনের কাছে লিখিতভাবে এবং সরাসরি সাক্ষাৎ করে তাদের মতামত ও প্রস্তাব তুলে ধরেছে। সব দিক বিবেচনায় নিয়েই কমিশন সুপারিশ তৈরি করছে। তিনি বলেন, ‘পে-স্কেল নিয়ে পে-কমিশন কাজ করছে। তাদের কাজ একেবারে থেমে নেই। নিরবচ্ছিন্নভাবে তারা কাজ করছেন এবং আমাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন।’

অন্তর্বর্তী সরকার নতুন পে-স্কেল দিয়ে যেতে পারবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কমিশনের রিপোর্ট এলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। কাল-পরশু এ বিষয়ে কথা হবে। এখন ২১ জন সদস্য সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন দেবে। এর সঙ্গে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা রিপোর্ট থাকবে। ডিফেন্সের জন্য একটি সাব-কমিটিও রয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নির্বাচনের আগে পে-স্কেল কার্যকর সম্ভব নয় এমন মন্তব্য করেছেন উল্লেখ করে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘পে-স্কেল বিষয়ে গভর্নরের কিছু বলার এখতিয়ার নেই। গভর্নর ব্যাংকসংক্রান্ত বিষয়ে মতামত দিতে পারেন। পে-স্কেল পুরোপুরি সরকারের সিদ্ধান্ত।’

এ সময় জ¦ালানি সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘দেশ জুড়ে এলপি গ্যাস নিয়ে কাজ চলছে। জ্বালানি সরবরাহ আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জের, এ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’

ভেনেজুয়েলা এবং ইরান জুড়ে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে জ্বালানি তেলের মূল্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। সেই বিষয়ে সরকার কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘জ্বালানিতে ভেনেজুয়েলা ইন্ডিপেন্ডেন্ট। সেখানে হঠাৎ করে একটা প্রভাব পড়েছে, আমেরিকা কীভাবে ডিল করে, দেখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘জ্বালানির ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি একটা পরিকল্পনা করা হয়েছে। কয়েক দিন আগে একটা উপস্থাপনা দেওয়া হয়েছে, আমিও ছিলাম সেখানে। কারণ জ্বালানি তো আমাদের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি যদি আমরা নিশ্চিত করতে না পারি, লোকাল প্রোডাকশন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জ্বালানির দুটি দিক আছে পাওয়ার ও এনার্জি। ওই দুটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’

এ সময় পাঁচ ব্যাংকের অডিটরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে অর্থ উপদেষ্টা, ‘একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা কোন প্রেক্ষাপটে শেয়ার কিনেছেন, সেটা পরীক্ষা করা হচ্ছে। শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়টি কমপ্লিকেটেড (জটিল)। বললেই তো হবে না, এসব বিষয়ে হুট করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা বলছি ডিপোজিটররা টাকা পাবেন, এটা খুব সহজ। যার টাকা জমা আছে, সে টাকা পাবেন। আর শেয়ারহোল্ডাররা শেয়ার প্রেক্ষাপটে কিনেছে, মার্কেট প্রাইসে কিনেছে।’

জানা গেছে, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে সরকারিভাবে ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যাতে করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। এতে সরকারের ব্যয় হবে ২৩০ কোটি ৭২ লাখ ৬৭ হাজার ৮০০ টাকা।

এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) রয়েছে। প্রশিক্ষণ, সনদ প্রদান ও লাইসেন্স ইস্যু করা হবে নির্ধারিত নিয়ম ও মানদ- অনুসরণ করে।

বৈঠকে স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে সোনারগাঁ সিড ক্রাশিং মিলস লিমিটেডের কাছ থেকে এক কোটি লিটার সয়াবিন তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রতি লিটার সয়াবিনের দাম ধরা হয়েছে ১৮৫ টাকা ৮৫ পয়সা। এ হিসাবে এক কোটি লিটার তেল কিনতে ব্যয় হবে ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। শিল্প মন্ত্রণালয়ের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরবের সাবিক এগ্রি-নিউট্রেন্টস কোম্পানি থেকে ৪০ হাজার টন বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতি টনের দাম ৩৯০ মার্কিন ডলার হিসাবে ১৯১ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় হবে। টিসিবির জন্য এ তেলা কেনা হচ্ছে।

সভায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দুটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ^ব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা শীর্ষক প্রকল্পের বিআরটিএ অংশের একটি প্যাকেজের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩০ কোটি ৭২ লাখ ৬৭ হাজার ৮০০ টাকা। এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকার ও ওপেক ফান্ডের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘বরিশাল-লক্ষ্মীপাশা-দুমকি সড়কের ২৭তম কিমি এ পান্ডব-পায়রা নদীর ওপর নলুয়া-বাহেরচর সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের একটি প্যাকেজ অনুমোদন করা হয়েছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯৯ কোটি ৬২ লাখ ৭৪ হাজার ৩৪৬ টাকা।

এ বৈঠকে চারটি মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি প্রস্তাবনা থাকলেও চারটি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রস্তাব আলোচ্য বিষয় থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।