বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এখনো পূর্ণতা লাভ করেনি। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।’ গতকাল মঙ্গলবার এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ আয়োজিত ‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এমন কথা বলেন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ওই সেমিনারে প্রধান অথিতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, রাজনীতিকদের উচিত জনগণের আস্থা অর্জনের দায়িত্ব নিজেরাই পালন করা। তিনি বলেন, ‘পার্লামেন্টের বাইরে সিভিল সোসাইটি, এনজিও এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সরকার প্রকৃত জবাবদিহিতা ও জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে না।’
আমীর খসরু বলেন, ‘বিএনপি বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনারের আয়োজন করছে এবং প্রতিটিতে অন্তত এক ঘণ্টা প্রশ্নোত্তর পর্ব রাখা হচ্ছে। আমরা শুধু বক্তৃতা দিয়ে চলে যাই না। জনগণের মতামত জানতে চাই। এভাবেই রাজনীতিকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, সিভিল সোসাইটিকে শুধু কার্যকর করা নয়, সহায়তা (ফ্যাসিলিটেট) করতে হবে। যেকোনো সরকারের পক্ষে এককভাবে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আগামীতে সরকার গেলেও বিএনপি সিভিল সোসাইটি, প্রাইভেট সেক্টর, এনজিওসহ সব পক্ষের সঙ্গে পার্টনারশিপের ভিত্তিতে কাজ করবে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪- এই তিন সময়ের চেতনা একই সূত্রে গাঁথা। সামাজিক সুবিচার, মানবিক মর্যাদা ও বৈষম্যবিরোধী আকাক্সক্ষা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আন্দোলন-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দেশ রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিচার, নির্বাচন, সংস্কার ও নাগরিক অধিকার এই চারটি বিষয় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এখনো পেশিশক্তি ও ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গত এক বছরে এতে কতটা পরিবর্তন এসেছে তা প্রশ্নবিদ্ধ।’
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, জনগণ পরিবর্তন চায় এবং পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আর মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। এ কারণেই তিনি দল ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম বলেন, আজ ২ হাজার টাকায় ভোট বিক্রি করলে আগামী পাঁচ বছরে এস্টাবলিশমেন্টের পকেটে অন্তত ২০০ কোটি টাকা চলে যাবে।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন বলেন, জুলাই সনদ ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি সংরক্ষণের গ্যারান্টি দেয়নি। তাই তারা সনদে স্বাক্ষর করেননি এবং আসন্ন গণভোটে অংশ নেবেন না।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, দেশে এমপি না থাকলেও ডিসি-এসপিসহ আমলারা যদি সৎ থাকেন, তাহলে রাষ্ট্র ৬০-৭০ শতাংশ সুন্দরভাবে চলবে। রাজনীতিবিদদের আমলাতন্ত্রে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত সেমিনারের উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ও নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ায় গভীর শাসন সংকট তৈরি হয়েছে। এরই ফলে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ঘটে। এই অভ্যুত্থানে স্পষ্ট হয়েছে অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তিতে দেশ পুনর্গঠনের সময় এসেছে। ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪-এর চেতনার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। প্ল্যাটফর্ম আটটি বিভাগীয় শহরে পরামর্শ সভা, ১৫টি যুব কর্মশালা ও অনলাইনের মাধ্যমে দেড় হাজারেরও বেশি স্থানীয় অংশীজন ও তরুণের মতামত সংগ্রহ করেছে। এতে ১৫০টিরও বেশি সহযোগী সংগঠন যুক্ত ছিল।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ।