সিলেট হবিগঞ্জের বাসিন্দা কাকলী আক্তার (ছদ্মনাম)। বেশ আগে টানা বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে দুই কন্যাসন্তান নিয়ে আশ্রয় নেন নিকটস্থ একটি আশ্রয়কেন্দ্রে। সেখানে নারী ও শিশুদের সঙ্গে ছিল পুরুষও। টানা ২৮ ঘণ্টা ওই আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানের সময় তিনি নানা ধরনের কটূক্তি ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। দুর্যোগকালীন এমন ঘটনাগুলো শুধু কাকলী আক্তারে সঙ্গেই নয়, হয়েছে উপকূলের ৭৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ নারী ও শিশুর সঙ্গে। এ ছাড়া ওই সব আশ্র কেন্দ্রে নানা ধরনের চুরির অপরাধেও নারী ও শিশুদের দায়ী করে নির্যাতন করার তথ্য ওঠে এসেছে উপকূলীয় অপরাধ নিয়ে করা পুলিশের এক গবেষণায়।
কয়েক দিন ধরে উজানের ঢল ও টানা বর্ষণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্লাবিত জনপদ ছেড়ে হাজারও মানুষ আশ্রয় নিচ্ছেন স্কুল, কলেজ ও সাইক্লোন শেল্টারসহ বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। তবে নিরাপত্তার জন্য এসব কেন্দ্রে গেলেও নারী ও শিশুদের জন্য সেখানে আরেক ধরনের ঝুঁঁকি তৈরি হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে নারী-পুরুষের মিশ্র অবস্থান, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় যৌন হয়রানি, কটূক্তি ও নির্যাতনের আশঙ্কা বাড়ছে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আশ্রয়কেন্দ্রকে শুধু দুর্যোগ থেকে প্রাণরক্ষার স্থান হিসেবে দেখলে হবে না; এটিকে নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্রে নারী, পুরুষ ও শিশুদের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা নেই। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ টয়লেট, নারী স্বেচ্ছাসেবক কিংবা অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁঁকি আরও বাড়ে।
সম্প্রতি পুলিশ স্টাফ কলেজের গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের এক গবেষণায় ওঠে এসেছে, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানকারী নারী ও শিশুদের বড় একটি অংশ যৌন হয়রানি, কটূক্তি কিংবা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হন। গবেষণায় অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের তথ্য অনুযায়ী, আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানকালীন ৭৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ নারী ও শিশু কোনো না কোনো ধরনের যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। গবেষণাটি উপকূলীয় অঞ্চলের ৩৮৫ জন বাসিন্দার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এতে দুর্যোগকালীন অপরাধের ধরন, ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, দুর্যোগকালে সংঘটিত অপরাধের সবচেয়ে বেশি শিকার হন নারীরা। মোট ভুক্তভোগীর ৫১ দশমিক ২৩ শতাংশ নারী, ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশ শিশু এবং ১৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবীণ। পুরুষ ভুক্তভোগীর হার মাত্র ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। গবেষণায় অংশ নেওয়া একাধিক নারী জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে রাতের বেলায় কটূক্তি, শরীরে অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ, ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা অভিযোগ করেন না। কারণ অভিযোগ করলে সামাজিকভাবে হেনস্তা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, আবার অনেক সময় অভিযোগ গ্রহণের মতো কার্যকর ব্যবস্থাও থাকে না। দুর্যোগকালীন সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ তুলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। দুর্যোগের সময় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংকট তৈরি হলে এমন অভিযোগের প্রবণতা বাড়ে, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত অপরাধের চেয়ে গুজব বা সন্দেহের ওপর নির্ভরশীল।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের তথ্য ওঠে এসেছে গবেষণায়। অংশগ্রহণকারীদের ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ জানিয়েছেন, দুর্যোগকালীন সময়ে তারা আশ্রয়কেন্দ্র বা আশপাশে পুলিশের উপস্থিতি দেখেননি। অন্যদিকে যারা পুলিশের উপস্থিতি দেখেছেন, তাদের প্রায় অর্ধেকের মতে, পুলিশ মূলত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কিংবা সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত ছিল। ফলে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ছোট ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ অনেক সময় নজরের বাইরে থেকে যায়। দুর্যোগকালীন উপকূলের নারী ও শিশুদের নিরাপদ রাখতে হলে প্রথমেই আমাদের আশ্রয় কেন্দ্রগুলো নারী, শিশু ও পুরুষের জন্য আলাদা করার সুপারিশসহ আরও কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে একেবারে সম্ভব না হলে অন্তত নারী ও শিশুদের ফ্লোরগুলো পৃথক করতে হবে। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে নারী ও শিশুদের জন্য সোশ্যাল এডুকেশন সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে উপকূলে ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার করতে হবে। যাতে নারী ও শিশুরা যেকোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হলেই অভিযোগ করতে পারে। সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে দুর্যোগকালীন উপকূলে নারী ও শিশুদের নিরাপদ রাখা যাবে।
টানা বৃষ্টির কারণে দেশের সাত জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা বন্যাকবলিত রয়েছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের অনেকে ইতোমধ্যে আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।
জানতে চাইলে সিলেট জেলার পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্যোগ, বন্যা পরিস্থিতিতে আশ্রয়ণ কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। বিশেষ করে নারী-শিশু যাতে কোনো ধরনের কটূক্তি কিংবা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার শিকার না হন, সেদিকে খেয়াল রাখতে সব থানাকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। পাশাপাশি এ বিষয়ে জনসচেতনতা গড়ে তোলার কাজও করা হচ্ছে।
ভোলা জেলার এসপি মো. শহীদুল্লাহ কাওছারও জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রের নারী-শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের ঘনত্ব বাড়ছে। ফলে প্রতি বছরই বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং লিঙ্গসংবেদনশীল পরিকল্পনা সেই হারে এগোয়নি। ফলে একই ধরনের ঝুঁকি বারবার ফিরে আসছে। তাদের মতে, প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ও শিশু সুরক্ষা পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং কমিউনিটি পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর গোপন ও সহজ ব্যবস্থা চালু করলে অনেক ভুক্তভোগী সামনে আসতে পারবেন। দুর্যোগের সময় মানুষের প্রথম প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়। তাই আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলোকে নারী ও শিশুবান্ধব ও নিরাপদ করে তোলার বিষয়টিকে এখনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের তথ্য মতে, বাংলাদেশে ৩ কোটি ১০ লাখ শিশু এমন এলাকায় বাস করে, যেখানে নদীর পানি বেড়ে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে এবং এই সংখ্যাটি আমাদের মোট শিশুর অর্ধেকেরও বেশি। নদীর পানি বাড়লে তা শুধু ঘরবাড়ি কেড়ে নেয় না। কেড়ে নেয় স্কুলে যাওয়ার সুযোগ, বিশুদ্ধ পানি এবং একটি শিশুর নিরাপত্তাবোধ।