অথনৈতিক সংকটে জনজীবনে নেমে আসা চরম দুর্ভোগের ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অন্তত ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশটির সরকারি এক কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন। এদিকে, ইরানকে হুমকি দিয়েই চলছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলমান বিক্ষোভে দমন-পীড়নের ঘটনায় ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে, এমন দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন তিনি। গত সোমবার ট্রুথ সোশ্যালে তিনি জানিয়েছেন, এ শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। পাশাপাশি ইরানে অবস্থানরত নিজ দেশের নাগরিকদের অবিলম্বে দেশটি ছাড়ার আহ্বান জানিয়ে জরুরি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সরিয়ে নিতে কোনো সরকারি সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। অন্যদিকে, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকালীন পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা ট্রাম্পের। বৈঠকে ইরানের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের এক সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ-প্রতিবাদে কমপক্ষে ২ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তাদের মধ্যে দেশটির বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন। এই প্রাণহানির ঘটনায় সন্ত্রাসীদের দায়ী করেছেন ওই কর্মকর্তা। দেশটিতে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ-সহিংসতায় এত বেশিসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির কথা প্রথমবারের মতো স্বীকার করল ইরানি কর্র্তৃপক্ষ। রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানির ঘটনায় ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তবে বিক্ষোভ-সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক কতজন রয়েছেন, সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি তিনি। বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জেরে ইরানে চলমান এই বিক্ষোভকে গত তিন বছরে ইরানি কর্র্তৃপক্ষের জন্য ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিক্ষোভের পাশাপাশি গত বছরের ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর দেশটির ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর ওপর আন্তর্জাতিক চাপও ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেই ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সোমবার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে কোনো দেশ ব্যবসা করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সব ধরনের বাণিজ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। ট্রাম্প আরও জানান, এই শুল্ক ব্যবস্থা ‘তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর’ হবে। এই আদেশ চূড়ান্ত এবং অপরিবর্তনীয় বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে কোনো ধরনের লেনদেনকে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা ধরা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তেল রপ্তানিকারক দেশ ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তেহরান এখনো এই বিষয়ে জনসমক্ষে কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও, ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা চীন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, চীন নিজের স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘একতরফা নিষেধাজ্ঞা’ ও ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’-এরও বিরোধিতা করেছে বেইজিং। গত ২৮ ডিসেম্বর স্থানীয় মুদ্রার দরপতন ও চরম অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ৬৪৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫০৫ জন বিক্ষোভকারী এবং ১১৩ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। এ ছাড়া ১০ হাজার ৭২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভার্চুয়াল অ্যাম্বাসি তেহরান’ এক বিবৃতিতে জানায়, গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরান জুড়ে চরম অস্থিরতা ও বিক্ষোভ চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তেহরান কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সংঘাতময় এই পরিস্থিতিতে অনাকাক্সিক্ষত ঝুঁকি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের দ্রুত ইরান ত্যাগ করতে বলা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদ, গ্রেপ্তার ও দীর্ঘমেয়াদে আটক হওয়ার উচ্চঝুঁকি রয়েছে। এমনকি কোনো কারণ ছাড়াই কেবল যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী হওয়ার কারণে যে কেউ আটক হতে পারেন। যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে, তাদের ইরানি পাসপোর্ট ব্যবহার করে দ্রুত দেশ ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর যারা এই মুহূর্তে কোনোভাবেই ইরান ছাড়তে পারছেন না, তাদের নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার এবং প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার ও পানি মজুদ রাখার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। সেই সঙ্গে যেকোনো ধরনের ঝুঁকি বিবেচনা করে এবং স্থানীয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরে ভ্রমণ পরিকল্পনা করার জন্য নাগরিকদের সতর্ক করা হয়েছে।
পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে মঙ্গলবার আলোচনায় বসার কথা ছিল ট্রাম্পের। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন বিকল্প তৈরি রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক হামলা, গোপন সাইবার অস্ত্রের ব্যবহার, তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়ানো ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন পক্ষকে সহায়তা দেওয়া। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি তেহরান। এমন সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক পদক্ষেপের পথ বেছে নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। তবে এতে বিপুল পরিমাণ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে। কারণ, ইরানের অভিজাত বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ড কোরসহ সামরিক বাহিনীর বেশ কিছু ঘাঁটি খুবই জনবহুল এলাকায় অবস্থিত।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়াটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সঠিক হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই বড় দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা তাদের মধ্যে রয়েছেন রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পল ও ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার। সম্প্রতি ফক্স নিউজকে ওয়ার্নার বলেন, ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানের সরকার উৎখাতের ঘটনা এমন সব পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যা ধীরে ধীরে সত্তরের দশকের শেষের দিকে দেশটিতে ইসলামি বিপ্লবের পথ তৈরি করে দিয়েছিল।