১৯৯৮ সালের ১২ জুলাই। প্যারিসের সেই অবিস্মরণীয় রাতে ফ্রান্স শুধু একটি ট্রফি জেতেনি, ফিরিয়ে এনেছিল দর্শকদের বিশ্বাস। কাটিয়ে উঠেছিল পরাজয়ের ভয় আর অপূর্ণতার বেদনা। সেদিন থেকেই জন্ম নেয় এমন এক লিগ্যাসির, যার প্রভাব আজও বহন করে ফরাসি ফুটবল।
১৯৯৮ সালের আগে ফরাসি ফুটবল ছিল এক অদ্ভুত এক ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দি। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম স্থপতি হয়েও ফ্রান্স ছিল সাফল্যবঞ্চিত। সৌন্দর্যপূর্ণ খেলায় পারদর্শী হলেও চূড়ান্ত জয়ের মুহূর্তে তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ‘মহিমান্বিত পরাজয়’ -এর এক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর মানসিক বোঝায়। এই বোঝার জন্ম হয়েছিল তিনটি বড় ট্রমা থেকে।
প্রথম আঘাতটি আসে ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে, ইতিহাসে যা পরিচিত ‘সেভিল ট্র্যাজেডি’ নামে। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে প্যাট্রিক বাতিস্তোঁর ওপর গোলরক্ষক হারাল্ড শুমাখারের ভয়াবহ ফাউলের কোনো শাস্তি হয়নি। অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে এগিয়েও টাইব্রেকারে হেরে যায় ফ্রান্স। মিশেল প্লাতিনি, অ্যালাঁ জিরেস, জঁ তিগানা ও লুই ফার্নান্দেজের ‘ম্যাজিক স্কয়ার’ ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করলেও শিরোপা অধরা থেকেই যায়। এখান থেকেই জন্ম নেয় সেই ধারণার—সুন্দরভাবে হারাই যেন ফ্রান্সের নিয়তি।
দ্বিতীয় ট্রমা ছিল নিখাদ অপমানের। প্লাতিনির প্রজন্মের বিদায়ের পর ইউরো ’৮৮ ও বিশ্বকাপ ১৯৯০ আসরে জায়গা করে নিতে ফ্রান্স ব্যর্থ হয়। ইউরো ’৯২-তেও তারা ছিল নিষ্প্রভ। তবে সবচেয়ে অন্ধকার রাত আসে ১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বর। পার্ক দে প্রাঁসে বুলগেরিয়ার বিপক্ষে একটি ড্র করলেই বিশ্বকাপে যেত ফ্রান্স। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এমিল কস্তাদিনভের গোলে সব স্বপ্ন ভেঙে যায়। সেদিন পরাজয় আর মহিমান্বিত ছিল না, সেটা ছিল মানসিক ভাঙনের প্রতিচ্ছবি।
তৃতীয় ট্রমা আসে এক কলঙ্কিত সাফল্য থেকে। ১৯৯৩ সালে মার্সেই ইউরোপিয়ান কাপ জিতে প্রমাণ করেছিল, তারা ফরাসি ক্লাবও জিততে পারে। কিন্তু ভ্যালেন্সিয়েনের সঙ্গে ম্যাচ পাতানোর কেলেঙ্কারিতে সেই সাফল্য হারায় পবিত্রতা। মার্সেইয়ের শিরোপা কেড়ে নেওয়া হয়, দল নেমে যায় নিচের লিগে। সেভিল ১৯৮২, ১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্যর্থতা, ১৯৯৩ সালের কলঙ্কিত ইউরোপ জয় এবং বুলগেরিয়ার বিপক্ষে হৃদয়ভাঙা হার—এই চারটি ঘটনা মিলেই গড়ে তোলে ফরাসি ফুটবলের হীনম্মন্যতা।
এই পটভূমিতে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স শুধু জয় চায়নি, চেয়েছিল মুক্তি। তারা চেয়েছিল এমন এক সাফল্য, যা প্রশ্নাতীত, যা অতীতের সব ক্ষত সারিয়ে দেবে। ফাইনালের পর ফরাসি সংবাদমাধ্যম লিখেছিল, ‘পুরো গ্রহটাই নীল—ফ্রান্সের নীল’। এটি শুধু একটা জয় ছিল না, ছিল ফরাসি ফুটবলের পুনর্জন্মের ঘোষণা। ব্রাজিলের মতো ফুটবলের দেবতাদের ৩-০ গোলে হারিয়ে ফ্রান্স বদলে দিয়েছিল ইতিহাসের ধারা।
এতদিন যারা ছিল চিরকাল দ্বিতীয়, অর্থাৎ চেষ্টা করেও শীর্ষে না পৌঁছানোর সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয় ফ্রান্স। এই সাফল্য আসে অতীতকে অনুকরণ করে নয়, বরং তা প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৯৮-এর দলটির শক্তি ছিল দুর্দান্ত রক্ষণ। সাত ম্যাচে মাত্র দুই গোল হজম করে তারা, একটি আবার পেনাল্টি থেকে। জিনেদিন জিদানের সঙ্গে সঙ্গে নায়ক হয়ে ওঠেন লিলিয়াঁ থুরাম, যিনি সেমিফাইনালে দুটি অবিশ্বাস্য গোল করেন। শৈল্পিকতার বদলে শৃঙ্খলা ও বাস্তবতাকে গ্রহণ করে ফ্রান্স মুক্ত হয় অভিশাপ থেকে।
এই সাফল্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছেন কোচ আইমে জাকে। যিনি একসময় ছিলেন সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু, তিনিই হয়ে ওঠেন জাতীয় নায়ক। লেকিপ পত্রিকার নেতৃত্বে তার বিরুদ্ধে চলেছিল নজিরবিহীন সমালোচনা—তার কৌশল, তার উচ্চারণ, এমনকি এরিক কান্তোনা ও ডেভিড জিনোলাকে দলে না রাখাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। বিশ্বকাপের আগে ২৮ সদস্যের প্রাথমিক দল ঘোষণার দিন লেকিপের শিরোনাম ছিল, ‘আমরা কি ১৩ জন নিয়ে খেলছি?’ অথচ জনমত জরিপে দেখা যায়, ৭২ শতাংশ ফরাসি জনগণ জাকের ওপর আস্থা রাখে।
আইমে জাকে তার দলকে বাইরের সবকিছু থেকে রক্ষা করতে তৈরি করেছিলেন এক সুরক্ষিত বলয়। সততা, পরিকল্পনা আর খেলোয়াড়দের প্রতি অটল বিশ্বাসই ছিল তার শক্তি। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের জয় কেবল ফুটবলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন বর্ণ ও সংস্কৃতির খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলটি হয়ে ওঠে এক নতুন ফ্রান্সের প্রতীক। ‘ব্ল্যাক-ব্লঁ-বুর’ স্লোগানটি প্রকাশ করে ঐক্যের বার্তা। রাষ্ট্রপতি জাক শিরাক একে বলেছিলেন, মানবিক ও বহুবর্ণ ফ্রান্সের সুন্দর ছবি। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফ্রান্সকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও ঐক্যের স্বাদ দিয়েছিল।
এই জয় ফরাসি যুব উন্নয়ন ব্যবস্থাকেও বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করে। ক্লেয়ারফোঁতেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে আদর্শ মডেল। পরবর্তীতে জার্মানি পর্যন্ত এই মডেল অনুসরণ করে, যার ফল তারা পায় ২০১৪ বিশ্বকাপে। জিদান হয়ে ওঠেন জাতীয় প্রতীক। আর্ক দ্য ত্রিয়ঁফে তার মুখচ্ছবি প্রদর্শন ছিল ইতিহাসের অংশ। তার পথ ধরে ফরাসি শিশুরা স্বপ্ন দেখতে শেখে বিশ্বকাপ জয়ের।
সেই দলের অধিনায়ক দিদিয়ের দেশ্যম পরবর্তীতে কোচ হিসেবে সেই উত্তরাধিকার বহন করেন। ২০১৮ সালে দেশ্যমের অধীনেই দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতেছিল ফ্রান্স। সেই জয় জয় প্রমাণ করে, ১৯৯৮ বিশ্বকাপ কোনো দুর্ঘটনা নয়। সেটা ছিল নতুন এক সংস্কৃতির সূচনা। ফরাসি ফুটবলে আজও ১৯৯৮ সালের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এটি শুধু স্মৃতি নয়, এক দিশারি। ২০২৬ বিশ্বকাপে নামার সময়ও ফ্রান্স বহন করবে সেই উত্তরাধিকার, জিদানের হাতে তোলা ট্রফির স্মৃতি।