ইরানে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা দেশব্যাপী বিক্ষোভে অন্তত ২ হাজার ৫৭১ মানুষ নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিক্ষোভকারী, বেসামরিক নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ এ তথ্য জানিয়েছে। এদিকে, ইরানের বিক্ষোভকারীদের ‘দেশপ্রেমিক’ অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, সাহায্য আসছে। আপনারা বিক্ষোভ চালিয়ে যান এবং আপনাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ওয়াশিংটন যদি তাদের ওপর কোনো হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোয় পাল্টা আঘাত হানবে তেহরান। এ বিষয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোকেও সতর্ক করেছে ইরান।
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকার মধ্যে ধনকুবের ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স সেখানে তাদের স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা বিনামূল্যে প্রদান করছে। ইরানে স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা একজন প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪০৩ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু যাচাই করেছে। এ ছাড়া সরকার সংশ্লিষ্ট ১৪৭ জন, ১৮ বছরের নিচে ১২ জন এবং বিক্ষোভে অংশ না নেওয়া ৯ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর তথ্যও নিশ্চিত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার এক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশ জুড়ে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা অস্থিরতায় প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর পেছনে ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন সাধারণ নাগরিক আর কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি তিনি। সম্প্রতি ইরানের শাসকদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিক্ষোভ দমনে ইরানে কঠোর অভিযান নিয়ে একাধিকবার সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন তিনি। গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের হাতে সব ধরনের বিকল্প রয়েছে।
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বিক্ষোভকারীদের রাজপথ না ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ইরানের দেশপ্রেমিকরা, আপনারা বিক্ষোভ চালিয়ে যান। আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিন। সাহায্য আসছে। তবে ট্রাম্প তার পোস্টে ‘সাহায্য আসছে’ বললেও সেটি কী ধরনের সাহায্য, তা পরিষ্কার করেননি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি তাদেরই বুঝে নিতে হবে। তিনি বলেন, ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্ধারিত সব বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘বিবেচনাহীন হত্যাকাণ্ড’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। ট্রাম্প আরও বলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর যারা নির্যাতন চালাচ্ছে, তাদের নাম মনে রাখুন। কারণ এর জন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে।
এদিকে ট্রাম্পের এ মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। তেহরানের অভিযোগ, ট্রাম্প ইরানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে এবং সহিংসতায় উসকানি দিতে এমন মন্তব্য করছেন। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ওপর কোনো হামলা চালায়, তবে তাদের মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো তেহরানের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে। গতকাল বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, তেহরান আঞ্চলিক দেশগুলোকে বলেছে (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক) যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায় তাহলে তাদের দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হবে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, যদি ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে তাহলে তারা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবেন। অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধ্বংসাত্মক বিদেশি হস্তক্ষেপের কড়া নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার হুমকিকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যা দিয়েছে রাশিয়া। গত মঙ্গলবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এমনটাই জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যারা বাইরের উসকানিতে সৃষ্ট অস্থিরতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে চালানো আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি করার পরিকল্পনা করছে, তাদের অবশ্যই জানা উচিত যে এমন পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনবে।
বিক্ষোভ দমনের জন্য ইরান সরকার গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে রেখেছে। তবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকার মধ্যে ধনকুবের ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স সেখানে তাদের স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা বিনামূল্যে প্রদান করছে। প্রযুক্তিভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘হোলিস্টিক রেজিলিয়েন্স’-এর নির্বাহী পরিচালক আহমদ আহমাদিয়ান বলেন, ইরানে স্টারলিংকের যেসব অ্যাকাউন্ট আগে নিষ্ক্রিয় ছিল, সেগুলোতে এখন সংযোগ দেওয়া হয়েছে এবং গত মঙ্গলবার থেকে সেগুলোর সাবস্ক্রিপশন ফি মওকুফ করা হয়েছে। সিএনএনকে আহমদ আহমাদিয়ান বলেন, এটি এখন শুধু প্লাগ ইন ও কানেক্ট করার বিষয়। স্যাটেলাইট টার্মিনালটি শুধু এমন কোথাও রাখতে হবে; যেখান থেকে আকাশ পরিষ্কার দেখা যায়, তবেই কাজ শুরু হবে।