বাহিনী ছাড়ছেন ইউক্রেনীয় সেনারা

ইউক্রেনের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ গত বুধবার জানিয়েছেন, দেশটির প্রায় দুই লাখ সেনা অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন। সামরিক ভাষায় একে ‘অ্যাবসেন্ট উইদাউট অফিসিয়াল লিভ’ (এডব্লিউওএল) বা কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই নিজেদের অবস্থান ছেড়ে চলে যাওয়াকে বোঝানো হয়। নতুন প্রতিরক্ষা প্রধান হিসেবে নিজের নিয়োগ নিশ্চিত করার ভোটের আগে ইউক্রেনীয় পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে ফেদোরভ আরও বলেন, সামরিক দায়িত্ব এড়ানোর কারণে প্রায় ২০ লাখ ইউক্রেনীয় নাগরিককে বর্তমানে ‘ওয়ান্টেড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অনেক বড় এবং শক্তিশালী এক শত্রুর বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষা করার চেষ্টায় ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী বছরের পর বছর ধরে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে। সম্মুখ সমরের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। সেখানে ইউক্রেনের সেনারা জনবল ও অস্ত্রশস্ত্রে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাদের মনোবল ভেঙে পড়া এবং উচ্চহারে দলত্যাগের গুঞ্জন দীর্ঘকাল ধরেই শোনা যাচ্ছিল, তবে ফেদোরভের মন্তব্যটিই প্রথম, যেখানে কোনো ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা এই সমস্যার প্রকৃত মাত্রা প্রকাশ করলেন।

ইউক্রেনের আইন অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী সব পুরুষকে সেনাবাহিনীতে নিবন্ধন করতে হয় এবং সবসময় প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঙ্গে রাখতে হয়। তবে ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সীরাই কেবল বাধ্যতামূলকভাবে সেনা সমাবেশ বা মোবিলাইজেশনের আওতায় পড়েন।

ইউক্রেনের সামরিক আইন অনুযায়ী, ২৩ থেকে ৬০ বছর বয়সী সামরিক সেবার যোগ্য সব পুরুষের দেশত্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও কয়েক হাজার মানুষ অবৈধভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।

গত বুধবার ফেদোরভের সঙ্গে বৈঠকের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, দেশের সামরিক নিয়োগ বা মোবিলাইজেশন প্রক্রিয়ায় ‘ব্যাপক পরিবর্তন’ প্রয়োজন।

ফেদোরভ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এ যাবৎকালের সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তিআগামী সপ্তাহে তিনি ৩৫ বছরে পা দেবেন। তিনি দেনিস স্মিহালের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। দেনিস বর্তমানে ইউক্রেনের প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং জ্বালানিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

ফেদোরভ এর আগে ইউক্রেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই দায়িত্বে তিনি অন্যান্য উদ্যোগের পাশাপাশি ইউক্রেনের সফল ড্রোন যুদ্ধ প্রকল্প তদারকি করেন। বুধবার বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ইউক্রেনের জনবল সংকটের কারণে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘আরও বেশি রোবট মানে আরও কম ক্ষয়ক্ষতি, আরও বেশি প্রযুক্তি মানে আরও কম মৃত্যু। ইউক্রেনীয় বীরদের জীবনের মূল্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে।’

যুদ্ধের ময়দানে ইউক্রেন বিপুল সংখ্যায় সেনাসদস্য হারাচ্ছে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫ সালে প্রায় ৫ লাখ সেনা হারিয়েছে। এই বিশাল ক্ষতি শিগগিরই পূরণ করার সামর্থ্য কিয়েভের নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাশিয়াও তেমনটাই মনে করছে।

সপ্তাহ দুয়েক আগে ৫ লাখ সেনা হারানোর তথ্য দিয়ে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রিয়ে বেলৌসোভ দেশটির প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের উপস্থিতে এক বিশেষ বৈঠকে বেলৌসোভ বলেছিলেন, ২০২৫ সালের শুরু থেকে সংঘাতে এতগুলো সেনা প্রাণ হারানোর কারণে ইউক্রেনের জন্য নিকট ভবিষ্যতে বাহিনী পুনর্গঠন করা কঠিন। ব্যাপক প্রাণহানি এবং যুদ্ধজনিত চাপের কারণে বেসামরিকরা সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানে আগ্রহ হারাচ্ছে।

তিনি বলেন, সামরিক ক্ষতির মাত্রা শুধু প্রাণহানি পর্যন্ত সীমিত নয়। চলতি বছর ইউক্রেন ১ লাখ ৩ হাজারের বেশি সমরাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামও হারিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ৫ হাজার ৫০০ ট্যাংক এবং সাঁজোয়া যানযে সাহায্যগুলো পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে দিয়েছিল।

অবশ্য ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফেদোরভ জানান, বর্তমানে ইউক্রেনের ৫০০টি কোম্পানি ড্রোন উৎপাদন করছে, ২০০টি প্রতিষ্ঠান জ্যামিং সরঞ্জাম তৈরি করছে এবং ২০টিরও বেশি বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করছে।