স্মৃতির ছায়াবন
স্মৃতির ছায়াবনে দাঁড়িয়ে থাকি আমি
পাতারা কথা বলে না, তবু সব জানে
যে মানুষগুলো একদিন আমাকে ভালোবেসেছিল
তারা এখন কেবল সময়ের ব্যাকরণে ভুল বানান
এখানে আলো আসে দেরিতে
আর অন্ধকার আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে
ভালোবাসা ছিল একধরনের ভ্রান্ত দর্শন
আমি বিশ্বাস করেছিলাম, তাই শাস্তি পেয়েছি
শহর আমাকে সভ্য হতে শিখিয়েছে
কিন্তু মানুষ হতে দেয়নি
প্রতিটি হাসির নিচে জমে আছে
অভিনয়ের ক্লান্ত ইতিহাস
স্মৃতি খুব নিষ্ঠুর
সে কিছুই ভুলে না, শুধু বিকৃত করে রাখে
যাদের আমি ছাড়তে চেয়েছি
তারাই প্রতিদিন আমার ভিতরে ফিরে আসে
এই ছায়াবনে ঈশ্বর নেই
আছে কেবল প্রশ্ন আর দীর্ঘ নিঃশ্বাস
আমি জানি, মুক্তি বলে কিছু নেই
তবু প্রতিদিন একটু করে পালানোর অনুশীলন করি
স্মৃতির ছায়াবন থেকে বেরোনোর পথ জানি না
হয়তো পথই নেই
মানুষ একবার মনে পড়লে
সে আর কখনো পুরোপুরি মৃত থাকে না।
একাকিত্বের ঈশ্বর
বেলা ডুবে যায়, চাঁদও পালায়
বর্ষা পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে
নিজের জল গুটিয়ে নেয়।
শুধু আমার দুঃখ
কোথাও যায় না।
সে জানে এই শহরে মানুষের জন্য
কোনো নিরাপদ রাত নেই
কোনো বৈধ নিঃশ্বাস নেই
কখনো সে আসে দল বেঁধে
সমাজের মুখোশ পরে
নৈতিকতার লাঠি হাতে
আমার দরজায় আঘাত করে
বারবার
বারবার।
কখনো আসে একা
নিঃশব্দ অত্যাচারীর মতো
বিছানার পাশের অন্ধকারে বসে
আমার শরীর নয়
আমার আত্মা ছুঁয়ে দেখে।
আমার একাকিত্বের আঙিনায়
তার স্থায়ী ঠিকানা—
এখানে প্রশ্ন করাই অপরাধ
চিৎকার করাও শালীনতা ভঙ্গ।
আমি যদি না কাঁদি
তবে আমাকে পাথর বলে
আমি যদি কাঁদি
তবে আমাকে দুর্বল বলে।
এই দুঃখ আমাকে ছাড়ে না
কারণ আমি মাথা নত করিনি
কারণ আমি চুপ থাকিনি
কারণ আমি
নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছি
এই অপরাধের কোনো
ক্ষমা নেই।
তুমি বলেছিলে আরো একটি নতুন কবিতা দাও
দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে আমার ভিতরের শহর
বুকের উপত্যকায় ছাই উড়ে যায় নীরব আগুনে
গলি গলি ধোঁয়ার মতো ঘুরে বেড়ায় তোমার শব্দ
পুরোনো দরজার ফাঁক দিয়ে আসে ফিসফিসে হাওয়া
যেন কেউ ডাকছে— ফিরে আয়, ফিরে আয় ঘরে।
অদৃশ্য বিস্ফোরণে জর্জরিত সময়
মানুষেরা দৌড়াচ্ছে অস্থির আতঙ্কে
আর আমি দাঁড়িয়ে আছি কেবল একা—
তোমার বলা শেষ বাক্যটির দিকে তাকিয়ে।
তুমি বলেছিলে
যখন চারপাশ ভেঙে পড়বে, আমাকে ধরে থাকো।
আমি ধরে ছিলাম
কিন্তু নদীগুলো তাদের তীর হারিয়েছে
রাস্তার সেতুগুলো ভেঙেছে অদৃশ্য ভারে
চেনা মুখগুলো ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেছে
নগরীর ছাইয়ের
কালো, দমবন্ধ করা গন্ধে।
তোমার স্মৃতির জানলায় হেলান দিয়ে
মাঝরাতে শুনি অনাগত সকালের কান্না।
পৃথিবী ভেঙে পড়লেও
তোমার কণ্ঠস্বর বেঁচে থাকে
জীবনের শেষ আশ্বাসের মতো।
তুমি বলেছিলে
‘আমাকে বাঁচাও …’
আমি জানি
আমি হয়তো বাঁচাতে পারব না শহর
না মানুষের বিধ্বস্ত জীবন
কিন্তু তোমাকে
তোমাকে আমি বাঁচাতে চাই
আমার শেষ আলো দিয়ে
শেষ শ্বাস দিয়ে
শেষ অবশিষ্ট আগুন দিয়ে।
আর যদি সবকিছু শেষ হয়ে যায়
ধ্বংসের কালো অন্ধকার যদি পুরোটা গ্রাস করে নেয়
তবুও মনে রেখো তুমি বলেছিলে
আর আমি শুনেছিলাম
যেন প্রতিশ্রুতির মতো।