মাতামুহুরীর বাঁকে 

স্মৃতি এমন কোনো বস্তু নয়, আপনি যখন ইচ্ছা বের করে দেখতে পারবেন। সময়ের সাথে সাথে ক্ষয়ে যায়। প্রতারক সে।

লিয়ান (বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বান্ধবী) ফোন দিয়ে বলল, মাতামুহুরী মাধ্যমিক বিদ্যালয় বাচ্চাদের নিয়ে একটা আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করছে চট্টগ্রাম/ঢাকায় অবস্থিত শিল্পীদের নিয়ে, আমি আগ্রহী কিনা? একটু খোঁজ নিয়ে দেখলাম, যে স্কুল থেকে এটা আয়োজন করা হচ্ছে তার প্রধান শিক্ষক আমাদেরই বন্ধু মোমেন। অভিজ্ঞতা শুরু করার আগে মোমেনকে নিয়ে দুই-একটা কথা বলা দরকার। মোমেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের সেশনেরই (২০১৪-১৫) দর্শন বিভাগের একজন শিক্ষার্থী ছিল। আমাদের ক্যাম্পাস শহরে হওয়ায়, মূল ক্যাম্পাসে খুব একটা যাওয়া হইত না। যখন কোনো প্রয়োজনে যেতাম, তখন মোমেন ও তার অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা হইত। আমরা বিভিন্ন পাহাড়ে যাইতাম, পুকুর পাড়ে যাইতাম এবং শিল্প-সাহিত্য-দর্শন নিয়ে কচকচানি দিতাম।

আমরা সবাই কলা অনুষদের হওয়ার ফলে একটা অলিখিত আত্মীয়তা অনুভব করতাম। মোমেন ছোটখাটো গড়নের মানুষ, কিন্তু সদালাপী। তার হিউমার ভালো। হাসি ঠাট্টার ছলে কঠিন কথা বলে ফেলার এক গুণ তার আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয়-চতুর্থ বর্ষ থেকেই মোমেনের পাহাড়ে যাওয়া আসার ব্যাপারে আমরা অবগত ছিলাম। আমাদের বেশ কয়েকবার দাওয়াত ও দিছে, কিন্তু আমার যাওয়া হয় নাই। যখন দেখলাম, এই আর্ট ক্যাম্পের আয়োজক মোমেন নিজেই, তখন এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করল এই ভেবে যে– আমার বন্ধু মোমেন পাহাড়ি কোনো এক স্কুলের হেডমাস্টার এবং এ দেশে শিক্ষকতার মত একটা কম অর্থহীন (!) অথচ মহৎ পেশাকে বেছে নিছে। দ্বিতীয়বার না ভেবেই আর্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণের ব্যাপারে রাজি হয়ে গেলাম। আর্টক্যাম্পের নাম “মাতামুহুরির বাঁকে”।

যারা চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিছে, তারা দুপুরেই দিয়ে দিছে। আর ঢাকা থেকে আগতরা উঠবে রাতের বাসে। ব্যাক্তিগত কাজে দুপুরে রওনা দিতে না পারাই, ঢাকা থেকে আগত পরিচিতদের সাথে যোগ হয়ে গেলাম। সকাল ৮/৯ টায় চকরিয়া স্টেশনে নেমে টমটম করে আলীকদম আবাসিকের মুখে নামলাম। এখান থেকেই খাড়া পাহাড় বেয়ে মারাইংতং। আজকের দিনটা আমরা ওখানে কাটাব এবং আগামীকাল স্কুল এবং গ্রামের বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাব। পাহাড়ের গাঁ বেয়ে বেশকিছু থাকার ব্যবস্থা আছে। তার পাশেই একটা রেসোর্টে গতকাল রাত্রিযাপন করছে চট্টগ্রাম থেকে আগত শিল্পীরা। রিসোর্টটা পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষেই বানানো, রুমের বারান্দা থেকে মাতামুহুরি ও পাড়াগুলো দেখা যাচ্ছে আধো ঢাকা কুয়াশাতে। সকাল-সকাল পৌঁছে, আমরাও বাকি সঙ্গীদের সাথে মিলিত হলাম। এখানে ঢাকা/চট্টগ্রাম থেকে আগত শিল্পীদের সংখ্যা প্রায় ষাটের কাছাকাছি। গ্রুপ-গ্রুপ হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সবাই রিসোর্টের বিভিন্ন জায়গায়।

রাস্তায় আসার সময় যে মাতামুহুরীকে আধোঘুম চোখে দেখে আসলাম, তাকেই এখন দেখছি পাহাড়ের চূড়া থেকে। সুন্দরী মাতামুহুরী এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে সাগরের দিকে। পাদদেশে দেখা যাচ্ছে, কুয়াশার ভিতরে লুকিয়ে থাকা গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রাম। শিল্পীরা জলরং দিয়ে আঁকছে দূরের কোনো পাহাড় অথবা নিকটস্থ কোন ঘরকে ক্লোজআপ করে। কেউ পেন্সিলে, কলমে ও ধরার চেষ্টা করছে দূরের কোনো পাহাড়কে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া এখানেই সারলাম। স্কুলের শিক্ষক ও বাচ্চারা মিলেই আয়োজন করেছে। অতঃপর বিকেল এবং ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটাকে আড়াল হতে দেখলাম, পাহাড় থেকেই। সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে রাখাল তার গরু আর ছাগলের পালগুলো নিয়ে নেমে চলে যেতে থাকে ধীর পায়ে। আর, এইসব দৃশ্যাবলীকে সেখানেই রেখে নেমে আসতে হলো আমাদের। 

সন্ধ্যা নামার পর পর আমরা পৌঁছায় স্কুলে। সামনে মাঠ, আর পাশে কেয়াং। কেয়াংয়ের যিনি ভিক্ষু তিনি নাকি এই পাঁচতলা স্কুলটার বিল পাস করিয়ে আনছে। এখানে আবার অনাথ আশ্রমও আছে। প্রায় ১০০-এর মত বাচ্চা থাকে এখানে। স্কুলের পাশে মেয়েদের জন্য একটা আশ্রম আছে, ওটা একতলা। সন্ধ্যায় পাড়ার বাজারে হাঁটাচলা করে সান্ধ্যকালীন নাস্তা খেলাম। রাতে খাবারের ব্যবস্থা আশ্রমেই হলো। সহযোগিতা ও পরিবেশনায় ছিল আশ্রমের বাচ্চারা। রাতের খাবারটা হলো একদম পাহাড়ি মেজাজে। বড়বটি সেদ্ধ, ঢেড়শ সেদ্ধ, বাধাকপি সেদ্ধ, বেগুন সেদ্ধ এবং সিধল (নাপ্পি) দিয়ে দুই ধরনের ভর্তা। একটা ছিল মরিচ ভর্তা, আরেকটা কি তা বুঝতেই পারি নাই। আমি যে এসব সেদ্ধ আর ভর্তার অনেক বড় ভক্ত এমন না। খাবার পুরোপুরি উপভোগ করতে পারি নাই, অভ্যস্ত না হওয়ার দোষে। তবে যখন মরিচ ভর্তা দিয়ে দুই-এক লোকমা মুখে দিলাম তখন আমার অনভ্যস্ততাও অভ্যস্ততার পর্যায়ে নেমে আসলো।

পাহাড়ি খাবার আমি যতবার খেয়েছি, তার শুরুতেই মরিচভর্তা জাতীয় কিছু একটা থাকে। যা আপনার খাদ্যগ্রহণ করার ইচ্ছা এবং খাবারের রুচি দুটাই বাড়িয়ে দেবে। রাতে অনাথ আশ্রমের বাচ্চারা আমাদের জন্য বারবিকিউর ব্যবস্থা করে এবং আয়োজন করা হয় দুম্বার মাংস দিয়ে। এই মাংস এসেছে সৌদি আরব থেকে– সৌদি সরকারের উপহার হিসেবে। চট্টগ্রাম শহর পেরিয়ে এসে আলীকদমের দূরের একটা গ্রামে কম্বল মুড়িয়ে দিয়ে ভাবছি – পৃথিবীটা আসলে কতটা ছোট। এর পরের দিনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের বাচ্চারা আসবে সকালে। আমরা তাদের সাথে আঁকাআঁকি করব, তাদের মাটি দিয়ে বিভিন্ন কাজ করে দেখাব। তাই আর রাত না বাড়িয়ে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়াটা উত্তম।

সকালে ঘুম ভাঙার পর চোখ খুলে দেখি পুরো হেডমেন পাড়াকে কুয়াশা তার চাদরে লুকিয়ে রেখেছে। রাস্তা ধরে কতদূর হাঁটার পরেই দেখলাম মাতামুহুরীকে। রাস্তার পাশে কেমন এঁকেবেঁকে চলে গেছে। গতকাল যে পাহাড় থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম এইসমস্ত গ্রাম, নদী-নালা; আজ নিচে দাঁড়িয়ে সেই পাহাড়কে দেখছি। অভিজ্ঞতাও আলাদা, অনুভূতিও আলাদা। স্কুলের পাশে যে বাজারটা রয়েছে– তার মধ্যেও রয়েছে সহাবস্থান। পাহাড়ি মহিলারা তাদের প্রচলিত পোশাক পড়ে বাজারে ঘুরছে। বয়স্ক লোকেরা আড্ডারত, অলস সময় কাটাচ্ছে। এই পাড়ায় সবচেয়ে স্মৃতিতে গেঁথে রাখার মত দৃশ্য হলো– মানুষের বসতবাড়িগুলো। এটা মূলত মারমা পাড়া। বাড়িগুলো উঁচা, মাটি থেকে। নিচের জায়গাটা অনেকেই অনেক কাজে ব্যবহার করে। কেউ মুরগী-হাঁস অথবা শুকর লালন-পালন করে। কেউ বা লাকড়ি সংগ্রহ করে রেখেছে নিচের জায়গাটাতে। বর্ষায় এই লাকড়ি হয়ে উঠবে তাদের প্রধান সম্বল। পাড়াগুলো বেশ পরিষ্কার। মাঝে সরু রাস্তা। দুইপাশে মানুষের বাস্তুভিটা। চারপাশে বিভিন্ন গাছগাছালি দিয়া এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িকে আলাদা করা হয়েছে। বেশিরভাগ গাছগুলোই ফুলের। বাড়িগুলা মূলত কাঠের, উপরে টিন। তবে বাড়ির উঠোন খুব পরিষ্কার। দুই-চারটা চেয়ার বাইরে ছড়ানো রয়েছে।

সময় যত গড়াতে লাগল কোলাহল বাড়তে থাকল। স্কুলের বাচ্চা, আশ্রমের বাচ্চা এবং গ্রামের বাচ্চারাও আসা শুরু করলো স্কুলে। স্কুলের ৫ম তলায় বাচ্চাদের কর্মশালার ব্যবস্থা হয়। সময় যত গড়াতে থাকে, বাচ্চাদের উপস্থিতি আরো বৃদ্ধি পায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো স্কুল প্রাঙ্গন বাচ্চাদের শব্দে মুখরিত হয়ে যায়। বাচ্চাদের কলরব শীতের কুয়াশাকেও ধীরে ধীরে বিলীন করে দেয়। সারি ধরে বসে বাচ্চারা আঁকতে শুরু করে। আর যারা মাটির কাজ করতে চায়, তাদের কাজ ও শুরু হয়ে যায়। বাচ্চাদের চিন্তা-চেতনার জগত অদ্ভুত। তাদের আঁকা মাতামুহুরী তাদের মতই চঞ্চল। সে পাহাড় থেকে জন্ম নিয়ে চলে গিয়েছে কারো বাড়ির ভিটার উপর দিয়ে। হয়ত তার ঠিকানা সেই পাহাড়ি শিশুটির মনের নিভৃতে। তাদের আঁকা মারাইংতং পাহাড় সুউচ্চ তো বটে, তবে অজেয় নয়। যারা মাটি দিয়ে কাজ করছে, তারা করছে ছোট ছোট পশু, পাখি। কেউবা কোন প্রাচীন মুখোশ, আরো কত কি! বাচ্চাদের ছবি আঁকা যখন ডিসপ্লে করা হলো– তখন দেখা গেলো হরেক রকমের ছবি এঁকেছে বাচ্চারা। তার মধ্যে বেশিরভাগই মাতামুহুরী এবং মারাইংতং পাহাড়। এছাড়াও প্রতিকৃতি, পাহাড়ি ঘর-বাড়ি এবং আরো নানান বিষয়-বস্তু। 

বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাতে কাটাতে দুপুরের সূর্য মধ্যগগণে উঠে গিয়ে তীব্রভাবে জানান দিচ্ছে তার উপস্থিতি। ক্যাম্প ও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসে। দুপুরে সৌদি সরকারের পাঠানো দুম্বার বিরিয়ানি করা হল। আমরা অতিথিরা, বাচ্চারা ও স্কুলের শিক্ষকরা সবাই মিলে দুপুরের খাবার শেষ করলাম। 
দেখতে দেখতে সময় শেষ হয়ে আসে আমাদের। মাতামুহুরীর বাঁকে কাটানো সময়– এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে থেকে যাবে আজীবন, এই কথা বুঝতে অসুবিধা হয় না আমার। স্মৃতি এমন কোনো বস্তু নয়, আপনি যখন ইচ্ছা বের করে দেখতে পারবেন। সময়ের সাথে সাথে ক্ষয়ে যায়। প্রতারক সে। মাতামুহুরী ও বাচ্চাদের এই স্মৃতি যেন ক্ষয়প্রাপ্ত না হয় তার একটা পাকাপোক্ত ব্যবস্থা হিসেবে থাকল এই লেখা।