১৯৫০ সালে প্রথমবার এক ফ্রেঞ্চ দল অন্নপূর্ণা সামিট করে, যা যেকোনো মানুষের প্রথম কোনো আটহাজারী শৃঙ্গে সফলতা। ওই ঐতিহাসিক অভিযানের দলনেতা মরিস হেরজগ ফ্রান্স আলপাইন ক্লাব এবং ফ্রান্স মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশনে এক সংক্ষিপ্ত বিবরণী জমা দেন। এই লেখাটি সেই বিবরণীর আলোকেই অনূদিত। আজ রইল দ্বিতীয় পর্ব।
ক্লান্তির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছি। এ সময় দর্শন পেলাম নিচে থেকে দেখা সেই দ্বিতীয় আইসফিল্ডের। তুষারধস থেকে সম্পূর্ণ রক্ষার উপায় নেই এখানে। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এক স্থানে রাত কাটানোর ব্যবস্থা হলো। পিঠের বোঝা নামিয়ে চারপাশটা দেখতেই আমরা নির্বাক! অসাধারণ সব পর্বত সামনে।
এরই মাঝে বরফ এবং ক্রমাগত তুষারধসের মাঝে অতি ক্ষুদ্র আমরা। কাছেই ফুলকপির মতো দেখতে এক রিজ। অল্প দূরে আমাদের পরিকল্পিত পথের সেই উত্তর-পশ্চিম ঢাল। কিছুটা দূরে সবার উপরে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ধৌলাগিরি। এর কাছেই অজেয় নীলগিরি। ডানে এক বিশাল দেয়াল পর্বতের গোড়া হয়ে মিশেছে মিরিস্তি-খোলাতে। সামনের দৃশ্য দুর্দান্ত। কিন্তু পিছনে মোটেই সুখের কিছু নেই। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং অন্নপূর্ণা!
এখান থেকে শুরু পর্বতের কঠিন অংশ। রসদ, স্বাস্থ্য, পথ, বিপদ এবং সীমিত সময় বিবেচনা করে ঠিক হলো তিন দলে ভাগ হয়ে যাব। এক দলে টেরি এবং দুই শেরপা। অন্য দলে আমি এবং দুই শেরপা। তৃতীয় দলে থাকবে কৌজি, লেচেনাল, রেবুফেট এবং শ্যাটজ। টেরি ও আমি শেরপাদের নিয়ে পথ তৈরি করব। আর তৃতীয় দল প্রয়োজনীয় রসদ পৌঁছে দেবে।
পথ এতটা ঢালু হবে সেটা আগে অনুমান করিনি। অতিকায় সেরাকগুলো এড়িয়ে যাওয়াও অসম্ভব। খাড়া ঢালে এবং ওভারহ্যাংয়ে চলার কৌশল শেখা আছে। কিন্তু এই উচ্চতায় জানা কাজটাই করতে বেশ বেগ পেতে হলো। কঠিন জায়গায় দড়ি বেঁধে নিচ্ছি মালামাল নেওয়ার সুবিধার্থে। পর্বত কিন্তু মোটেই আমাদের সঙ্গ দিচ্ছে না। কোমর পর্যন্ত তুষারে ডুবে আছে। এক পা হাত দিয়ে টেনে তুলে নিতে হচ্ছে পরের ধাপ। এত নরম তুষারে আইস-এক্স ব্যবহারও সমস্যা। প্রতিদিন দুপুরেই আবহাওয়ার অবনতি হয়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
এগিয়ে চলার কাজ মূলত আমরাই করছি। শেরপারা নির্দেশনা ছাড়া কিছু করছে না। বরফের খাড়া এক দেয়ালে চড়তে চায় কিনা জানতে চাইলে পানসি বিশাল এক হাসি দিয়ে জানায়, ‘না, ধন্যবাদ। এসব সাহেবদের কাজ’।
তুষারে ঢাকা এক ফাটলের সামনে ক্যাম্প-৩ বানিয়ে ফিরে সবাই বড্ড ক্লান্ত। শেরপারা উচ্চতায় অভ্যস্ত হলেও ৬,৫০০ মিটারের উপরে গেলেই ওদের শুরু হচ্ছে মাথাব্যথা। আর সাহেবরা নানারকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। কেউ মাথাব্যথায় কাতরাতে থাকলে ওষুধ দিচ্ছে। তাঁবুর জীবন বাইরে থেকে দেখে রোমান্টিক মনে হলেও আসলে অনেক কঠিন। বিকালে তাঁবুতে বসে পরদিনের ছক কষা লাগে। খাবার মুখে দিতেই কষ্ট হয়। সন্ধ্যা নামলেই এক গাদা ওষুধ পাকস্থলীতে চালান দিতে হয়। আবার সঙ্গীরা গিলেছে কিনা সেটাও দেখা লাগে।
লেচেনালের দিনদিন উন্নতি হচ্ছে। ঠিক করলাম সে আমার সাথে যাবে। টেরির সাথে একদিন অপেক্ষা করবে রেবুফেট। আর কৌজি ও শ্যাটজ যাবে ওদের পরদিন।
অবশেষে এলো সত্যিকারের পরীক্ষার সময়। প্রথম দল বেরিয়ে পরলাম চূড়ার লক্ষ্যে। এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে যেতে একদিন লাগলে ৩ জুন হবে কাঙ্খিত দিন। শেরপা সর্দার আং-থার্কে এবং এক শেরপাকে সাথে নিলাম। আং-থার্কে দুর্দান্ত সাহসী এবং অভিজ্ঞতায় ভরপুর। সে সাথে থাকলে বড় সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। ওর এবং আমার পছন্দের সাথী হলো ছোটোখাটো গড়নের আং-দাওয়া। সর্দারের দিকে ওর তাকানো দেখলে মনে হয় সামনে স্বয়ং ঈশ্বরকে দেখছে। রেবুফেট আর টেরির সাথে থাকল আং-থার্কের পর সবচেয়ে অভিজ্ঞ পানসি এবং তার ভাই আইলা।
ক্যাম্প-৪ এ যেতে হলো খুব খাড়া ঢাল দিয়ে। প্যাচপ্যাচে তুষারে ঢাকা বরফের উপর দিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে। ছোট হিমবাহের ধারে থাকা সেরাকের ছায়ায় ফেললাম তাঁবু। কল্পনাই করিনি যে এই আশ্রয়স্থল ফেরার পথে বিভীষিকা হয়ে গায়েব করে দেবে তাঁবুসহ মালামাল। দুই শেরপা নিচের ক্যাম্প থেকে বাকি তাঁবু আনতে নেমে গেল।
২ জুন। দারুণ ভোর। চা বানিয়ে আং-থার্কে ফেরার অপেক্ষায় বসে প্রকৃতি দেখছি। বাদাম ছাড়া কিছুই মুখে দেওয়া যাচ্ছে না। ভোরের দিকে তুষার জমাট থাকায় চলাচলে সুবিধা। তবুও সর্দার দেরি করে ফিরল। আজকের লক্ষ্য নিচে থেকে দেখা পাথুরে স্থানের উপর ক্যাম্প-৫ তৈরি। গভীর তুষার দ্রুত ক্লান্তি আনে। প্রতিপদেই আছে তুষারধসের শংকা। পরিকল্পনা ছিল একটা ঢাল বামপাশ দিয়ে আড়াআড়ি পেরিয়ে পাথুরে বাধা টপকে পৌঁছে যাব ক্যাম্প-৫ এ। নিচে থেকে সহজ মনে হলেও আদতে কাজটা বেশ কঠিন। অতি-উচ্চতা গভীরভাবে ভাবনার ক্ষমতা কমায়। অনেকগুলো জিনিস একসাথে ভাবতে তাই বেশ কষ্ট হচ্ছে। আপাতত শুধু ওই পাথুরে স্থানে পৌঁছাতেই পারলেই বেঁচে যাই।
বিধ্বস্ত অবস্থায় সেখানে পৌঁছে দেখি আমাদের অপেক্ষায় আছে একরাশ হতাশা। দেয়াল খুবই ঢালু। কোনো ফাটল নেই। পুরো দেয়ালেই পাতলা বরফের প্রলেপ। তাঁবু ফেলার মতো ন্যূনতম স্থানটুকুও নেই। আমাদের জীবনের সবচেয়ে খারাপ স্মৃতি উপহার দেওয়ার জন্য স্থানটির আজন্ম প্রতীক্ষার এইমাত্র অবসান হলো যেন! ওই খাড়া ঢালেই রাত কাটানোর স্থান তৈরি করতে হবে। দেরি না করে কাজে লেগে গেলাম। জমে থাকা তুষার কিছুটা সমান করে তাঁবু ফেললাম খাদের প্রান্তে। জীবনের কিছু মুহূর্তে নেতৃত্বের ক্ষমতা হারিয়ে দেয় মানবিকতা। এই অবস্থায় কোনো নির্দেশ দেওয়া অযৌক্তিক। তাই দুই শেরপার কাছে জানতে চাইলাম আমাদের সাথে থাকবে কি না।
আং-থার্কে জানাল সে চূড়ায় যেতে পারলে অনেক খুশি হতো। কিন্তু পা জমে গেছে। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে সারারাত মালিশ করা লাগবে। তাই ক্যাম্প-৪ এ নেমে গেলেই সে খুশি। শিগগির আমাদের একা করে দুই শেরপা বাতাসে মিলিয়ে গেল। অনেক কষ্টে চা বানিয়ে ওষুধ খেলাম। কোনো খাবার গলাধঃকরণ অসম্ভব। এটা সামিটে যাত্রার আগে শেষ রাত। কাপড় এবং জুতা নিয়েই ঢুকে গেলাম স্লিপিং ব্যাগে।
শুরু হলো ভয়ংকর এক রাত। প্রচণ্ড বাতাস বইছে। ক্রমাগত তুষার পরে তাঁবুর গায়ে জমছে। রাত গভীর হতেই অর্ধেক চাপা পড়েছি তুষারের নিচে। ভোরে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা থাকবে কিনা সেটা নিয়ে ভাবছি। যেন অনন্তকাল অপেক্ষায় আছি এই বিভীষিকাময় রাত পেরিয়ে ভোরের আলোর। পাশে লেচেনাল আছে অন্য যন্ত্রণায়। তাঁবু পাথরের সাথে বাঁধা আছে। তবুও আমাদের নিয়ে তাঁবুটি যেকোনো সময় ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যাবে ভেবে ভীত ও। অবশেষে ভোর হলো। মনের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে থেকেও জমে কঠিন হয়ে যাওয়া জুতা পায়ে দিলাম। সাথে নিলাম জমাট দুধ, কিছু বাদাম, এক জোড়া মোজা এবং ক্যামেরা। কিন্তু এত যত্ন নেওয়া ক্যামেরা ৭,৫০০ মিটারের পর আর কাজ করেনি।
ভোর ৬টায় শুরু হলো আমাদের শীর্ষ যাত্রা। ভোরটা খুব ঠান্ডা, কিন্তু সুন্দর। শক্ত তুষারের আস্তরে ক্র্যাম্পন ভালোই দাঁত বসাতে পারছে। মাঝেমাঝে তুষারের চাদর ভেদ করে খুব নরম মিহি তুষারে ডুবে যাচ্ছি। কয়েকশ মিটার পর লেচেনাল জুতা আঁটোসাঁটো করে লাগিয়ে মোজা ঠিক করতে বসল। এর ফাঁকেই আশপাশটা ভালোভাবে দেখে নিলাম। অতিকায় ধৌলাগিরি বাদে আমরা এখন সবকিছুর উপরে। নিচে মাথায় গেঁথে যাওয়া বিস্তীর্ণ অঞ্চল। চিন্তাশক্তি অক্ষত হলেও মনে হচ্ছে কোনো ভিনগ্রহে আছি। চোখের সামনেই সামিট রিজ। একেবারে ডান দিক ঘেঁষে এক খাঁড়া ঢাল আছে। ওটা দিয়ে চূড়ার দিকে যাওয়া যাবে ভেবে ঐদিকেই চলা শুরু করলাম। সময় নিয়ে আপাতত ভ্রুকুটি করছি না।
বিশ্বাস করতে শুরু করেছি আজ কোনো বাধাই জয় ঠেকাতে পারবে না। পথ যথেষ্ট ভয়ংকর হলেও মোটামুটি সহজেই এগোনো যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর দম নেওয়ার জন্য থেমে উপরের দিকে তাকিয়ে ভাবছি কবে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে! শেষ কয়েক ঘণ্টা স্মৃতি বেশ ঝাপসা। শুধু মনে আছে রিজে উঠে বামদিকে আড়াআড়ি পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম চূড়ায়।
তুষারের সাগর এত কষ্টে পাড়ি দিয়ে চূড়ায় পৌঁছানোর অনুভূতি অবিশ্বাস্য। মনে উল্লাস। কিন্তু উপভোগের উপায়ও নেই। পা জমে যাচ্ছে দেখে দ্রুত নেমে যেতে চায় লেচেনাল। এক নজর বুলিয়ে নিলাম অন্তহীন দক্ষিণ ঢালের অসীম পথে। নিচে ভেসে বেড়াচ্ছে ছন্নছাড়া মেঘেদের দল। এ কি স্বর্গ, নাকি মর্ত্য! এই ক্ষণের অনুভূতি ভাষায় বর্ণনা অসম্ভব। আমার যৌবন কেটেছে শ্যামনির সবুজ উপত্যকায়। কিছুদিন আগেও ওখানের ৪৮০০ মিটার আমাকে বিস্মিত করত। যারা এতে চড়ত তাদের নায়ক ভেবে পূজা করতাম। আর এ স্বয়ং আটহাজার মিটার! অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে শ্যামনির সেই আমিই আজ এখানে দাঁড়িয়ে!
