মরিস হেরজগের ‘অন্নপূর্ণা’— শেষ পর্ব

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:৩০ পিএম

১৯৫০ সালে প্রথমবার এক ফ্রেঞ্চ দল অন্নপূর্ণা সামিট করে, যা যেকোনো মানুষের প্রথম কোনো আটহাজারী শৃঙ্গে সফলতা। ওই ঐতিহাসিক অভিযানের দলনেতা মরিস হেরজগ ফ্রান্স আলপাইন ক্লাব এবং ফ্রান্স মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশনে এক সংক্ষিপ্ত বিবরণী জমা দেন। এই লেখাটি সেই বিবরণীর আলোকেই অনূদিত। আজ রইল শেষ পর্ব।

পতাকা নিয়ে চূড়া থেকে দুই মিটার নিচে পাথরের ওপর নেমে এলাম। চারপাশে জমাট বরফ। তাই পতাকা ঠিক করতে বেশ বেগ পেতে হলো। ক্যামেরা ঠিক করতেও প্রয়োজন মনোযোগ। দ্রুতই এসব কাজ শেষ করে মনুষ্য বসতিতে ফিরতে চাই। আমি গুছিয়ে নেওয়ার ফাঁকেই লেচেনাল নামা শুরু করেছে। আনন্দ, গর্বের প্রতিবিম্ব ওই সামিটের দিকে শেষ একবার ফিরে দেখেই লেচেনালের যাওয়া পথে পা চালালাম। সকালে ফেলে আসা ক্যাম্প-৫ এ পৌঁছাতে অনেক দ্রুত নামতে হবে। কিন্তু শুরুতেই বিপত্তি। একটি দস্তানা খুলতেই তা হাত ফসকে গড়িয়ে অতলে মিলিয়ে গেল।

এই দুর্ঘটনার পরিণতি জানা থাকায় অসহায়ের মতো সেদিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। এরপর লেচেনালকে ধরতে দ্রুত পা চালালাম। আবহাওয়া আবার খারাপ হতে শুরু করেছে। চারপাশটা গ্রাস করছে মেঘ। মেঘের ফাঁকে এক ঝলক ক্যাম্প-৫ দেখতে পেলেও তা পরক্ষণেই কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে গেল। তাঁবুর আগে শেষ বরফের ঢালের বাঁকে লেচেনালও মিলিয়ে গেল। তুষারপাত শুরু হওয়াতে ঠাণ্ডা বাড়ছে।

ক্যাম্পে পৌঁছে দেখলাম সেখানে একটার পরিবর্তে দুটি তাঁবু। রেবুফেট এবং টেরি সেখানে আমাদের অপেক্ষায়। লেচেনাল কোথায় জানতে চাইলে ওরা জানাল সে এখনো ফিরেনি। টেরি হাত ধরে ঝাঁকি দিতেই খেয়াল করল আমার হাত সাদা এবং কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছে। উত্তেজনায় এতক্ষণ খেয়ালই করিনি। আন্তরিকতার সাথে সে আমার হাত মালিশ করতে লাগল। পুরো অভিযানে টেরি অনেক সাহায্য করলেও সামিটে যেতে পারেনি। দুঃখ প্রকাশ করতেই সে উত্তর দিল, ‘তুমি চূড়ায় গিয়েছ মানে আমরা সবাই চূড়ায় গিয়েছি’।

বাইরে চিৎকার শুনেই টেরি লাফিয়ে উঠে দৌঁড় দিল। লেচেনাল ফিরেছে। একশ গজ নিচে পরে গেলেও সৌভাগ্যক্রমে ক্র্যাম্পন পতন ঠেকিয়ে দেওয়ায় সে প্রাণ নিয়ে ফিরেছে।

৭,৫০০ মিটারে নেমে এল আরেকটা রাত। সঙ্গীদের উপস্থিতি অনেকটা প্রশান্তি নিয়ে এলেও এই রাত ভয়ঙ্কর। মাঝরাতে আবারো তুষারে দেবে গেলাম। হাত বুকের ওপর দিয়ে রাখলাম শ্বাস-প্রশ্বাসের জায়গার জন্য। চারপাশে মেঘ, ক্রমাগত তুষারপাত পরিস্থিতিকে দুর্বিষহ করে তুলছে। ভাবনায় তখন শুধু দ্রুত নিচে নেমে দেখাশোনা করার জন্য সতেজ বন্ধুদের কাছে পাবার চিন্তা। ভোর হতেই নামা শুরু হলো। কিন্তু ১০ মিটার সামনের পথও দেখতে পাচ্ছি না। বরফে পথ খুঁজে খুঁজে নামছি। পাগলের মতো বাকি দিন কোমর সমান তুষারে তাঁবু খুঁজলাম। সবচেয়ে সতেজ টেরিই মূলত পথ দেখাল আমাদের। সামনে ওঁৎ পেতে থাকা বিপদ ভালোমতো দেখতে চশমা খুলে ফেলে ও। পরদিন সম্পূর্ণ তুষার-অন্ধ হয়ে এই ভুলের মাশুল দেয় টেরি।

অন্নপূর্ণা

রাত নেমে এলেও ক্যাম্প-৪ এর দেখা নেই। এই এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফেলেছি। কিন্তু তাঁবুর চিহ্নই নেই। ঘন কুয়াশায় এবং ক্রমাগত তুষারপাতে পায়ের নিচের মাটিকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। উপায় না দেখে পরিণতি কী হতে পারে জেনেও খোলা স্থানে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। আশ্রয় নেওয়ার মতো একটা ফাটল খুঁজছি সবাই। লেচেনাল দড়ির শেষ মাথা পর্যন্ত এগিয়ে যেতেই হঠাৎ দেখি চোখের সামনেই অদৃশ্য হয়ে গেল। আতঙ্কিত হয়ে গর্তটার দিকে এগুলাম। কাছে যেতেই নিচের ফাটল থেকে দৈববাণী ভেসে এলো। এমন মধুর শব্দ বহুদিন শুনিনি। ফাটলের নিচে রাতে থাকা যাবে। একে একে সবাই ভূগর্ভস্থ আবাসে নেমে এলাম। হয়তো আমাদের সমাধিস্থলও হতে পারে!

সাথে পানি নেই। কিছু খেতে পারার তো প্রশ্নই উঠে না। বুঝতেই পারছি তলোয়ারে শান দিয়ে বসে আছে আরেকটি ভয়ঙ্কর রাত। লেচেনালের পায়ের তালু ও আমার চারটি আঙুল জমে শক্ত হয়ে আছে। টেরি আমাদের পা যত জোরে পারে ঘষছে। নিজের পা নিয়েই শঙ্কায় থাকা রেবুফেট এক কোণায় আশ্রয় নিয়েছে। টেরি সাথে একটি স্লিপিং ব্যাগ এনেছে। সেটা আমাদের ভাগাভাগি করতে অনুরোধ করল। রেবুফেটও কিঞ্চিৎ উষ্ণতার জন্য পা ঢুকিয়ে দিয়েছে। এই নারকীয় অবস্থায় আমি বিরক্ত। এই রাতই কি তবে অন্তিম রাত!

ভোরের প্রথম কিরণ সবেমাত্র গুহাতে ঢুকতে শুরু করেছে এমন সময় নামল তুষারধস। মাথার উপরটা ঢেকে গেছে। অবশ্য আমাদের অবস্থা আগেই এতো খারাপ যে এটা নিয়ে তেমন ভাবলাম না। যেভাবেই হোক এই জেল ভেঙে বের হতে হবে। রেবুফেট উপরে গিয়ে দড়ি লাগিয়ে দিল। অনেক কষ্টে সেই পথে উঠে গেল টেরি এবং খালি পায়েই লেচেনাল। পা মালিশ করতে গিয়ে গতরাতে জুতা খুলে রেখেছি আমরা। ভোরের তুষারধসে সেগুলো হারিয়ে গেছে। জুতা খুঁজতে নিচে থেকে গেলাম আমি। জুতা না পেলে এই আশ্রয়স্থান জীবদ্দশায় বিশ্রাম নেওয়া শেষ স্থান হবার সম্ভাবনা বেশি। ছোট ক্যামেরাটাও পেলাম না। খালি হাত-পায়ে ঘণ্টাখানেক তুষারে খুঁজে জুতা পাওয়া গেল। দেয়ালের তাজা তুষারে পায়ের নখ গেঁথে ফাটল থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরের পৃথিবী আজ বেশি সুন্দর মনে হচ্ছে। পর্বতে আজ অন্যদিনের চেয়ে কম আলো। চারদিক অদ্ভূত রকমের শান্ত। পৃথিবীতে শেষ দিন কি এমনই সুন্দরই হয়?

লেচেনাল কিছুটা অসংলগ্ন আচরণ করছে। জুতা ছাড়াই নামতে চায়। টেরি এবং রেবুফেট তুষার-অন্ধ হয়ে গেছে। লেচেনালের পা এবং আমার হাত-পা জমে গেছে। চারপাশটা দেখতেই বুঝতে পারলাম ক্যাম্প আসলে আমাদের ডানে নয়, বরং ছিল বামে। নিচে নামতে গেলে জুতা পরতেই হবে। লেচেনাল সফল হলেও আমার কাঠ হয়ে যাওয়া স্ফীত পা জুতাতে ঢুকছে না। আমার অন্তিমক্ষণ এসে গেছে ভেবে টেরিকে অন্যদের নিয়ে নেমে যেতে বললাম। কিন্তু সে আমাকে ছেড়ে যাবেই না। নিচের ক্যাম্পে থাকা শ্যাটজ এবং কৌজির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে অনেক চিৎকার করলেও কেউ উত্তর দিল না। টেরির অনেক পরিশ্রমের পর অবশেষে আমার পা জুতাতে ঢুকল। অর্ধমৃত আমরা এবার নামতে প্রস্তুত। একের পর এক বিপদ দেখে আনমনে ভাবছি অন্নপূর্ণা কি হারের প্রতিশোধ নিচ্ছে!

সামনের হিমবাহ পুরোটাই কুয়াশায় ঢাকা। হঠাৎ চক্ষু ছানাবড়া করা এক ব্যাপার ঘটে গেল। ২০০ মিটার দূরেই দেখি এক অবয়ব! শ্যাটজ কোমর সমান তুষার ঠেলে দ্রুত এগিয়ে আসছে। খারাপ সময় এবার বুঝি সমাপ্ত হলো! কাছে এসে কোনো শব্দ না করেই আমাকে জড়িয়ে ধরল। হারিয়ে ফেলা বাঁচার আশা আবার ফিরল। সত্যিকারের মানবিকতার অর্থ আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। আজ এর অর্থ আবার শিখলাম শ্যাটজকে দেখে। পর্বতে ধীরে ধীরে পরিষ্কার আলো ফুটছে। আবারো সূর্য আর নীল আকাশ দেখতে পাচ্ছি। এই অলৌকিক প্রাপ্তির খুশি ভুলিয়ে দিচ্ছে সব ব্যথা। এই কি পুণর্জন্ম!

শ্যাটজের পেছনে নামতে থাকলাম। পা অচল হওয়ায় শরীর দিয়ে তুষারে ঘষে গতিরোধ করতে হচ্ছে। ক্যাম্পের নেমে এলে কৌজি আমাকে কিছু খাওয়াতে অনেক চেষ্টা করল। শেরপারাও গরম পানি এনে দিল। কিন্তু আমার মাথায় তখন শুধু একটাই ভাবনা। দ্রুত ক্যাম্প-২ এ নেমে দেখতে হবে ঔদূত আমার হাত-পা বাঁচাতে কী করতে পারে। নিজের পায়ে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছি না। তাই সার্কি এবং আইলাকে বললাম, আমি দড়িতে ওদের দুইজনের মাঝে থেকে ক্যাম্প-২ পৌঁছাতে চাই। আবারও নামা শুরু হলো। কারো গতি মন্থর হলেই দ্রুত চলতে তাড়া দিচ্ছি।

নামার পথে লেচেনাল এবং টেরি

ভরদুপুরের সূর্য ঝলসে পড়ছে জমে থাকা তুষারে। চারপাশটা অনেক সুন্দর এবং আশ্চর্য রঙিন। কিন্তু আমি পর্বতের ছটফট অনুভব করছি, শুনছি এর হৃদকম্পন। পর্বতারোহীদের মধ্যে বিপদের সংকেত দিতে এক ধরণের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করে। এই অনুভূতিটা রোমকূপ খাড়া করে দিল। অবশেষে আশঙ্কা সত্যি হলো। দুই শেরপা আগে এবং রেবুফেট পেছনে চলছে। হঠাৎ পায়ের নিচে থেকে এক টুকরো পাথর সরে গিয়ে রেবুফেট পিছলে গেল। দ্রুত সরতে চাইলেও বিপদ এড়ানো গেলো না। আমিও গড়িয়ে পড়তে লাগলাম। চিৎকার, বরফে আঘাত, বাতাসে চক্কর, ঘুরপাক, আবারো বরফে আঘাত, আরেকবার চিৎকার! হঠাৎ দড়িতে টান পড়ল। যমরাজ টেনে নিচ্ছে? মঞ্চের নিচের পাঠাতন সরিয়ে নিলে ফাঁসির আসামি যেভাবে দড়িতে ঝুলতে থাকে বরফের এক প্রান্তে সেভাবেই ঝুলছি। সম্পূর্ণ শরীর দড়িতে জড়ানো। নিচের দিকে মুখ করে এই অবস্থা ঝুলে থাকা অস্বস্তিকর। হাতের কাছের বরফ ধরে অবস্থার উন্নতির পথ খুঁজছি। বেঁচে থাকার অনুভূতি দারুণ হলেও বাম বাহু ব্যথা, হাতে কোনো অনুভূতি নেই। ভেঙে গেছে কি না সেটাও বুঝতে পারছি না। উপরের দিকে তাকিয়ে আকাশে দেখলাম সার্কির মুখ। ভূমিতে পৌঁছে পাহাড়ের দিকে আবারো চোখ মেলে তাকালাম। না, পাহাড় আর আগের মতো সুন্দর লাগছে না!

রেবুফেট ৫০ মিটার গড়িয়ে পড়লেও অক্ষত আছে। এত কম সময়ে কী ঝড়টাই না গেল! ফসলের দেবী ‘অন্নপূর্ণা’ নামের প্রতি মোটেই সুবিচার করেনি। এর নাম বরঞ্চ হওয়া উচিৎ ছিল সুন্দর, কিন্তু নির্মম দেবী ‘কালী’।

আবারও নামার চেষ্টা করতেই হাত-পা ব্যবহার না করে কীভাবে নামবো এই নির্মম প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম। তবুও পারতেই হবে। ছিলে যাওয়া হাতের চামড়া দড়িতে লেগে থাকায় এতই বীভৎস দেখাচ্ছে যে কাপড় দিয়ে সেটা আড়াল করলাম। মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে নামছি। শেরপারা ঠিকমতো নিরাপত্তা দিতে পারছে না। আমিও ক্ষণে ক্ষণে গড়িয়ে যাচ্ছি। নিচে দূরে ক্যাম্প-২ এ মানুষ দেখলেও সেখান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব তো! শেষ ঢালে পৌঁছাতেই দুই শেরপা এগিয়ে এলো। ক্যাম্প-২ থেকে আইজ্যাক এবং ঔদূত ওদের পাঠিয়েছে। এদের একজন ফু-থার্কে এবং আরেকজন ওর বন্ধু। গরম পানীয় হাতে ফু-থার্কে আমার দিকে হতাশা নিয়ে তাকিয়ে রইল। ওর কাঁধে শরীরের সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দিলাম। আর আমার ঠিক পেছনে ছায়া হয়ে চলছে আং-থার্কে। উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষমান ঔদূত, আইজ্যাক এবং নোয়েলের কাছে কৃতজ্ঞচিত্তে নিজেকে সঁপে দিলাম।

অন্নপূর্ণার বুক অবশেষে শূন্য হলো। ক্ষুব্ধ দেবী প্রতিশোধ নিতে চাইলেও কাউকে রেখে দিতে পারেনি। ওর ক্রোধের কাছে হারিনি আমরা। তাঁবুতে হেলান দিয়ে শুয়ে বিধ্বস্ত আমার মনে এখন শুধুই প্রশান্তি। অসম এক সংগ্রাম এখন সমাপ্ত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত