শীতের রোগ ও সুস্থ থাকতে করণীয়

ঋতু পরিবর্তনের এই সময় সুস্থ থাকতে চাই সচেতনতা, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা ও পরিচ্ছন্নতা। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে, যা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তুলবে। ঋতুভেদে কিছু সহজ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। শীতে প্রধানত বাড়ে শ্বাসতন্ত্রের রোগ। বাতাসের তাপমাত্রা কমার সঙ্গে আর্দ্রতাও কমে যায়, যা আমাদের শ্বাসনালির স্বাভাবিক কর্মপ্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করে ভাইরাসের আক্রমণকে সহজ করে তুলে। শুষ্ক আবহাওয়া বাতাসে ভাইরাস ছড়ানোতেও সহায়তা করে। এ ছাড়া ধুলাবালির পরিমাণ বেড়ে যায়। ঠান্ডা, শুষ্ক বাতাস ইত্যাদি হাঁপানি রোগীর শ্বাসনালিকে সরু করে দেয়, ফলে হাঁপানি, সি.ও.পি.ডি এবং এমফাইসিমার প্রকোপ আরও বাড়ে।

শীতে সাধারণত ঠান্ডাজনিত সর্দি-কাশি বা কমন কোল্ড পরিচিত নাম। বিশেষত শীতের শুরুতে তাপমাত্রা যখন কমতে থাকে, তখনই এর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এ রোগের শুরুতে গলাব্যথা ও শুকনা কাশি, নাক বন্ধ, নাক দিয়ে অনবরত পানি ঝরতে থাকে এবং ঘন ঘন হাঁচি হয়। হালকা জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করা, দুর্বল লাগা ও ক্ষুধামান্দ্য ইত্যাদি দেখা দেয়। এটা মূলত শ্বাসতন্ত্রের ওপরের অংশের রোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। কোনো ক্ষেত্রে কাশি কয়েক সপ্তাহ থাকতে পারে। স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি হালকা গরম পানি পান ও হালকা গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করা উচিত। প্যারাসিটামল ও অ্যান্টিহিসটামিন জাতীয় ওষুধ খেলেই যথেষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাসের পরপরই ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করতে পারে। কাশির সঙ্গে হলুদ বা সবুজ রঙের কফ বের হলে, সঙ্গে জ্বর থাকলে ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তখন অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই রোগ আবার অন্যদের মাঝেও ছড়ায়। তাই রোগ যাতে অন্যদের আক্রান্ত করতে না পারে, সে লক্ষ্যে নেহায়েত বাইরে যেতে হলে মাস্ক ব্যবহার করা ভালো।

এই সময়টাতে সিজনাল ফ্লু ও ইনফ্লুয়েঞ্জাও বেশিমাত্রায় দেখা যায়, এগুলো মূলত ভাইরাসজনিত। লক্ষণগুলোও কমন কোল্ডের মতোই। ভাইরাসে আক্রান্ত দেহের দুর্বলতার সুযোগে অনেক সময় ব্যাকটেরিয়াও আক্রমণ করে থাকে। বিশেষ করে নাকের সর্দি যদি খুব ঘন হয় বা কাশির সঙ্গে হলুদ কফ আসতে থাকে, তা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণই ধরা হয়। এই রোগেরও তেমন কোনো চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না, লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হয়। শুধু ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলেই অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়। 

শীতের প্রকোপে শুধু ফুসফুস নয়, সাইনাস, কান ও টনসিলের প্রদাহও বাড়ে, যেমন সাইনুসাইটিস, টনসিলাইটিস, অটাইটিস ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে চিকিৎসা নিতে হয়। প্রায় ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়। যাদের হাঁপানি বা অনেক দিনের কাশির সমস্যা যেমন ব্রংকাইটিস, সিওপিডি, এম্ফাইসিমা ইত্যাদি  রোগ আছে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় তাদের কষ্টও বাড়ে। নিউমোনিয়াও এ সময় প্রচুর দেখা যায়। শীতে অসুখের মূল ধাক্কাটা যায় শ্বাসতন্ত্রের ওপরই। এসব রোগে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে নবজাতক, শিশু, বৃদ্ধ, হাঁপানি রোগী ও ধূমপায়ীরা।

ঠান্ডা ও হাঁপানি প্রতিরোধে করণীয় :

ঠান্ডা খাবার ও পানীয় পরিহার করা।

হালকা গরম পানি পান করা। গরম চা বা কফি পান করা।

প্রয়োজন মতো গরম কাপড় পড়া, তীব্র শীতের সময় কান-ঢাকা টুপি পরা এবং গলায় মাফলার ব্যবহার করা।

ধুলাবালি এড়িয়ে চলা ওধূমপান পরিহার করা।

ঘরের দরজা-জানালা সবসময় বন্ধ না রেখে মুক্ত ও নির্মল বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা।

হাঁপানি রোগী চিকিৎসকের পরামর্শে ইনহেলার বা অন্যান্য ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন। যাদের অনেক দিনের শ্বাসজনিত কষ্ট আছে, তাদের ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং নিউমোনিয়ার টিকা নেওয়া উচিত।

তাজা, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা, দেহকে সতেজ এবং রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করবে।

হাত ধোয়ার অভ্যাস করা, বিশেষ করে চোখ বা নাক মোছার পরপর হাত ধোয়া।

শীতে অন্যান্য রোগ : শীতে আরও অনেক রোগেরই প্রকোপ বেড়ে যায়।

 আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা শীতে বাড়তে পারে। মূলত বয়স্কদেরই এ সমস্যা হয়। যারা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রোসিস রোগে ভোগেন, তাদের এ সমস্যাটা আরও প্রকট। ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ সেবনের পাশাপাশি ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য গরম কাপড়, ঘরে রুম হিটার, গ্লাভস, কানঢাকা টুপি ব্যবহার করা। প্রতিদিন হালকা গরম পানিতে গোসল করা।

বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকে, তাই শুষ্ক বাতাসে ত্বক থেকে শুষে নেয় পানি, ঘাম ও তৈলাক্ত পদার্থ কম তৈরি হয়। ফলে শীতের শুষ্কতায় অনেকের ত্বক আরও শুষ্ক হয়, ত্বক ফেটে যায় এবং চর্মরোগ দেখা দেয়। শুষ্কতা কমানোর জন্য ভ্যাসলিন বা গ্লিসারিন, তেল বা ময়েশ্চার লোশন ব্যবহার করা। মুখে কোল্ড ক্রিম, ভ্যাসলিন, ঠোঁটে লিপজেল, লিপবাম বা চ্যাপস্টিক ব্যবহার করা ।

কড়া রোদও ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। তাই বাইরে গেলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা।

কিছু কিছু রোগে যেমন রেনডস ডিজিজে তীব্র শীতে হাতের আঙুল নীল হয়ে যায়। তাদের অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করা, যেন কোনোভাবেই ঠান্ডা না লাগে।

ঠান্ডা আবহাওয়ায় রক্তচাপ বাড়তে পারে। শীত তীব্র হলে হৃদযন্ত্রের রক্তনালি সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাকও হয়।

ছোট শিশুদের সর্দি-কাশির সঙ্গে ডায়রিয়াজনিত রোগও বাড়তে পারে, এ সময় রোটা ভাইরাসের আক্রমণও বেড়ে যায়। বাচ্চাকে ফোটানো পানি খাওয়ানো। রাস্তার খাবার, কাটা ফল, কোল্ড ড্রিংক এড়িয়ে চলা।

ভিটামিন ডি-এর স্বল্পতা দেখা দিতে পারে। কারণ এ সময়টাতে অনেকেই একেবারেই রোদে বের হন না। তাই ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত যেমন দুধ, ডিম, মাশরুম, কলিজা, টুনা, ম্যাকরেল, স্যালমন মাছ। কড লিভার অয়েল বা মাছের তেলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি। সকালের দিকে কিছুক্ষণের জন্য রোদে বসা, এতে সূর্যের আলো থেকে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।