ওষুধের নির্ধারিত দামে আপত্তি শিল্প মালিকদের

সংকটের মুখে দেশের ওষুধ শিল্প। গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের বাইরে প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অবস্থা নাজুক। ইতিমধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের কোনোটি বন্ধ হয়েছে, আবার কোনোটি বন্ধের পথে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে আলোচনা ছাড়াই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বৃদ্ধি ও দাম নির্ধারণ করেছে সরকার, যা দীর্ঘ মেয়াদে ওষুধ সরবরাহ ও শিল্পের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে ‘বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বাপি)।

বাপির দাবি, ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ যেন নির্বাচিত সরকার এসে করে। আর নির্বাচিত সরকার ওষুধসংশ্লিষ্ট যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওষুধ উৎপাদনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে নেয়।

গতকাল শনিবার গাজীপুরের একটি রিসোর্টে দিনব্যাপী কর্মশালায় বাপি নেতারা এসব তথ্য জানান। ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি : প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালা বাপি ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) যৌথভাবে আয়োজন করে।

জানা গেছে, গত ৮ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নতুন করে ১৩৫টি ওষুধ অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে ১১৭টি ওষুধের দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। পরে এই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় আরও কয়েকটি যুক্ত করা হয়। সরকারের তালিকা অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৫টি। সবগুলোর দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বাপি মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাড়ানো এবং সেগুলোর দাম নির্ধারণ দুটিই অত্যন্ত কারিগরি বিষয়। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের উচিত ছিল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসা। মতামত নেওয়া। কিন্তু আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ওষুধের দাম নির্ধারণের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু দাম নির্ধারণ যদি উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার বাস্তবতায় বিবেচনা না করা হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত টেকসই হয় না। গত ৮ থেকে ৯ মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে ঔষধ শিল্প সমিতির সঙ্গে কোনো কার্যকর যোগাযোগ নেই।’

ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী বা সচিব পর্যায়ের কেউই সমিতির সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেননি। এমনকি ওষুধ শিল্প-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাইসিং কমিটি ও অবজারভার তালিকা থেকেও বাপিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা কি এতটাই অপ্রয়োজনীয়? দেশের অন্যতম বড় শিল্প খাত হয়েও আমাদের কথা শোনা হচ্ছে না কেন? ওষুধের দাম নির্ধারণের জন্য যে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানে ওষুধ উৎপাদন বা ওষুধ ব্যবসার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে, এমন কাউকে রাখা হয়নি। যারা কখনো ওষুধ বানায়নি, এই শিল্পের ভেতরে কাজ করেনি, তারা কীভাবে ওষুধের কারিগরি বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে?’ কোনো কিছু বললে, ডব্লিউএইচওর গাইডলাইনের দোহাই দেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির কোষাধ্যক্ষ হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষাকারী পণ্য। সেজন্য ‘সেফটি এনশিউর’ করতে গিয়ে আমাদের যে কতগুলো ধাপ পার করতে হয়, তাতে যে কী পরিমাণ ব্যয় হয়, সেই হিসাব বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। যারা ওষুধ উৎপানের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের ফ্যাক্টরিতে প্রবেশের পোশাক থেকে শুরু করে সবই হতে হয় জীবাণুমুক্ত। নিয়মিত সবার মেডিকেল চেকআপ পর্যন্ত করতে হয়।

বাপি সভাপতি এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ১৯৯০ সালে যে দামে ওষুধ বিক্রি হতো, ২০২৫-২৬ সালেও সরকার সেই দাম বাড়াতে দিচ্ছে না। অথচ উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের দাম, শ্রম ব্যয় সবকিছুই বহুগুণ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকা অসম্ভব। ১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতি বাংলাদেশের ফার্মা শিল্পের স্বর্ণযুগের ভিত্তি। ওই নীতির ফলে দেশ ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। ২০১৬ সালের পর থেকে শিল্পের স্বাভাবিক প্রবাহে একের পর এক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। গত এক দশকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্যমূলক নীতি ও বাস্তবতা বিবর্জিত সিদ্ধান্ত শিল্পকে দুর্বল করে ফেলেছে।

ভেনেজুয়েলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কীভাবে একসময়ের সমৃদ্ধ অর্থনীতি ও শিল্পকে ধ্বংস করে দিতে পারে, ভেনেজুয়েলা তার বাস্তব উদাহরণ। একই পথে হাঁটলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পও অদক্ষ ও অকার্যকর হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত প্রায় ১০০টি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে। বাকি কোম্পানিগুলো নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে ৫০ থেকে ১০০ নম্বর অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। এই রুগ্ন কোম্পানিগুলোকে এখনই টেনে তুলতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ওষুধ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। ওষুধ শিল্পের প্রকৃত শক্তি ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো। অথচ বর্তমানে সেই ভিত্তিটাই ভেঙে পড়ছে। এসব কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে বড় কোম্পানিগুলো দেশের বাজারের চেয়ে রপ্তানিতে বেশি মনোযোগ দেবে। তখন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ওষুধের প্রাপ্যতা, দাম ও মান সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাপি সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ এবং সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ।